নিম্নতম দাবীনামার কিছু অংশ একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য

১) নির্বাচন উপলক্ষে পরামর্শ, নির্দেশ, শর্ত প্রভৃতি ছদ্মাবরণে সকল বৈদেশিক হস্তক্ষেপ অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। বিশেষতঃ আমেরিকা, ইইউ, ভারত, জাতিসংঘ, সৌদি আরব, বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, আইএমএফসহ সকল রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক, তথাকথিত দাতা গোষ্ঠি কর্তৃক এ দেশের রাজনীতিতে সকল হস্তপেকে অবৈধ ঘোষণা করা। যারা একগুঁয়ের ক্ষমতা করতে চায় তাদেরকে বহিস্কার করা।
২) কালো টাকার মালিক, ঋণ খেলাপি, রেল, পদ্মাসেতু, শেয়ার বাজার, হলমার্কসহ সাম্প্রতিকতম সরকারের আমলে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, চিহ্নিত সন্ত্রাসী-গডফাদারদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা এবং তাদের তালিকা প্রকাশ ও প্রচার করা।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের দ্বারা দাবিকৃত বিদেশে অর্থপাচারকারী, দেশদ্রোহী, জঙ্গী হামলা ও হত্যা-গুমের সাথে জড়িত রাজনৈতিক নেতা ও সন্ত্রাসী গডফাদারদের তালিকা প্রকাশ, তাদেরকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা। তাদের বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা।
৩) তথাকথিত ক্রসফায়ারের নামে বিনাবিচারে বন্দী হত্যা, গুম, মানবাধিকার বিরোধী, গণতন্ত্র বিরোধী ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের উদগাতা র‌্যাবকে নির্বাচন সংক্রান্ত সকল তৎপরতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। ইতিমধ্যে সংঘটিত প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশী হত্যাকান্ড ও গুমের সাথে জড়িত র‌্যাব-পুলিশের মধ্যকার প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা। এর সাথে জড়িত রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা ও তাদেরকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা।
৪) বিভিন্ন সময়কার সামরিক শাসন ও একদলীয় স্বৈরাচারী শাসনের হোতাদেরকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা।
৫) গণবিরোধী সশস্ত্র মৌলবাদী তৎপরতার আলোচিত গডফাদারদের তালিকা প্রকাশ, তাদের গ্রেফতার করা ও তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণকে নিষিদ্ধ করা।
৬) ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী এবং পাক-হানাদারদের পাবলম্বনকারী হিসেবে কর্মরত সকল দেশদ্রোহী নেতৃস্থানীয়দের তালিকা প্রকাশ করা এবং নির্বাচনে তাদের অযোগ্য ঘোষণা করা।
৭) নির্বাচনে ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতিকে ও ধর্মের সকল প্রকার ব্যবহারকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
৮) পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা। সেখান থেকে অঘোষিত সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও সকল সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার।
৯) প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হিসেবে দলগুলোর মাঝে অতিরিক্ত ২/৩ শ’ আসন বরাদ্দ করা।
জেলা-ভিত্তিক বা প্রতি তিন/পাঁচটি সাধারণ আসন পিছু একজন করে নারী প্রতিনিধি সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা।
জাতিগত ও ভাষাগত (উর্দুভাষী/বিহারী) সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরতি ঘোষণা করা।
শ্রেণী ও পেশাগত প্রতিনিধিত্বের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরতি ঘোষণা করা।
সকল প্রার্র্র্র্র্থীর সম্পদের তালিকা প্রকাশ, তা উপযুক্ত কর্তৃপ কর্তৃক যাচাই করা এবং স্ব স্ব এলাকায় সে তালিকা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে
প্রচারের ব্যবস্থা করা।
নির্বাচনের জন্য ব্যক্তিগত সকল খরচ নিষিদ্ধ করা। সকল প্রচার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় করা। জামানত প্রথা বাতিল করা।
১০) উপরোক্ত কার্যক্রমগুলো সম্পন্ন করার জন্য বিদ্যমান সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদপন্থী, উগ্রজাতীয়তাবাদী, ধর্মবাদী, সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক ও প্রতারণামূলক সংবিধান স্থগিত ঘোষণা করা। এবং তার অধীনে পরিচালিত বর্তমান সরকার বাতিল করা। উপরে আলোচিত নির্বাচনে অযোগ্য দল/ব্যক্তিবর্গ বাদে সকল প্রকৃত দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তি সমন্বয়ে একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করা, একটি অস্থায়ী সাংবিধানিক নীতিমালা গ্রহণ করা এবং তার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন সংবিধান রচনার জন্য একটি সংবিধান সভা নির্বাচন করা।

******
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল দল ও ব্যক্তি তথা প্রার্থীদের কাছে নিম্নোক্ত জরুরী দাবী নামার উপর সুস্পষ্ট ঘোষণা ও অঙ্গিকার আমরা দাবী করছিঃ
১। আমেরিকা-ভারতসহ সকল বৈদেশিক শক্তির সাথে সামরিক ও বেসামরিক যে নামেই হোক না কেন সকল অসম ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী চুক্তি বাতিল করা।
ভারতের সাথে হাসিনা-মনমোহন গণবিরোধী চুক্তি বাতিল করা। মার্কিনের সাথে টিকফা চুক্তি ও সন্ত্রাস বিরোধী সমঝোতা স্মারক বাতিল করা। সোফা, হানা চুক্তি বাতিল করা।
দেশ ও গণবিরোধী ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প ও রামপালে পরিবেশ ধংসকারী বিদ্যুৎ প্রকল্প, রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প অবিলম্বে বাতিল করা।
মাগুরছড়া ও টেংরাটিলার বিপর্যয়ের জন্য দায়ী বৈদেশিক কোম্পানীকে অবিলম্বে ক্ষতিপূরণ প্রদানে বাধ্য করা এবং এ জাতীয় সকল কোম্পানীকে এদেশে নিষিদ্ধ করা। ইতিমধ্যে সমুদ্রের তিনটি গ্যাস ব্লক ইজারা দেয়ার চুক্তি বাতিল করা।
চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়নে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং মার্কিনের সাথে কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণসহ সকল চুক্তি বাতিল করা।
বিদ্যুৎ খাতকে কোন ক্রমেই কোন বিদেশী সংস্থার হাতে তুলে না দেয়া।
সীমান্তে হত্যাকান্ড বন্ধ এবং ফেলানীসহ বর্বর হত্যাকান্ডগুলোর বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে উত্থাপন করা।
২। সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ, আধিপত্যবাদ, বর্ণবাদ, ইহুদীবাদকে দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করা, প্রতিক্রিয়াশীল সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন কর্মসূচির বিরোধিতা করা। ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ নামে বিশ্ব জনগণের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ-আগ্রাসনকে বিরোধিতা করা। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া, ইরানে সাম্রাজ্যবাদের হস্তক্ষেপ, আক্রমণ, আগ্রাসন, হুমকির সুস্পষ্ট বিরোধিতা করা।
৩। ‘খোদ কৃষকের হাতে জমি’ ও জমির সর্বোচ্চ সিলিং উর্বরতা ভেদে ১৫ থেকে ২৫ বিঘা নির্ধারণের ভিত্তিতে ভূমি সংস্কার করা। উদ্বৃত্ত জমি ও সকল খাস জমি ভূমিহীন-গরীব কৃষক ও কৃষি মজুরদের মাঝে বিনামূল্যে মাথাপিছু (পূর্ণ বয়স্ক নারী/পুরুষ নির্বিশেষে) বন্টন। নদী-খাল-বিল-ঘাট-বাজার ইজারা প্রথা বাতিল করা। বর্গা প্রথা অবসানের লে পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা গ্রহণ। উন্নয়ন ও শিল্পায়নের নামে কৃষি জমি দখলের রাষ্ট্রীয়, সাম্রাজ্যবাদী, সম্প্রসারণবাদী ও বড় ধনীদের কৃষক বিরোধী কর্মসূচির অবসান। মহাজনী ও এনজিও সুদের অবসানের লক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪। গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিুতম মজুরী ৮ হাজার টাকা দাবী অবিলম্বে মেনে নিয়ে কার্যকরী করা, ইন্ডিষ্ট্রিয়াল পুলিশ অবিলম্বে বাতিল করা।
রানা প্লাজা ও তাজরিন ফ্যাশনে নিহত-আহত-নিখোঁজদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা, আন্তর্জাতিক শ্রম আইন অনুযায়ী তাদের তিপূরণ অবিলম্বে প্রদান করা। দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি অবিলম্বে ঘোষণা করা। দায়ী গার্মেন্টস মালিক ও ভবন মালিকদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের তিপূরণ তহবিল গঠন।
২৪ এপ্রিল শ্রমিক হত্যা দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা। রানা প্লাজার স্থানে নিহত শ্রমিকদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা। রানা প্লাজার স্থানকে শ্রমিক স্মৃতিসৌধ নামকরণ করা।
বন্ধ কলকারখানা চালু করা, চাকুরীচ্যুত ও ছাঁটাইকৃতদের চাকরীতে অবিলম্বে বহাল করা।
৫। ইংলিশ মিডিয়াম, মাদ্রাসা ও সাধারণ এই তিন ধারার শিক্ষা বাতিল করে প্রকৃত এক ধারার শিক্ষা চালু করা। মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও জাতীয়করণ করা। মাধ্যমিক পর্যন্ত বিদেশী ভাষা শিক্ষা বাতিল করা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা চালু করা। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা চালু করা। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
৬। জমি ও সম্পদে নারীর সমঅধিকার প্রদান এবং প্রগতিশীল বিবাহ ও পরিবার প্রথা প্রবর্তন করা।
৭। সকল জাতিগত সংখ্যালঘুদের পৃথক জাতিসত্বার স্বীকৃতি এবং পার্বত্য অঞ্চলকে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা।
৯। চিকিৎসার বানিজ্যিকীকরণ বন্ধ করা। চিকিৎসা ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী বিনিয়োগ বন্ধ করা।
১০। পুলিশ ও বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার আলোচিত দুর্নীতির বিষয়ে পদপেক্ষ গ্রহণ।
১১। তথ্য-প্রযুক্তি আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ সকল কালাকানুন বাতিল করা।

Posted in আন্দোলন 15 | Leave a comment

অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে হলে কী প্রয়োজন?

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বন্দ্ব এখনও প্রকট। সাম্রাজ্যবাদী প্রভু আর দেশীয় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর (সামরিক আমলাতন্ত্র, বুর্জোয়া ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজ প্রভৃতি) চাপে সমঝোতা না হলে এই দ্বন্দ্ব আরো তীব্র রূপ নিতে পারে। এটা বুর্জোয়া শাসকশ্রেণীর একটি গুরুতর সংকট। যদিও এটা সাধারণ জনজীবনকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
নিজেদের সুবিধামত সংবিধান বদলে ফেলে এখন প্রধানমন্ত্রি সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন সংবিধান মতেই নির্বাচন হবে। অর্থাৎ তার নেতৃত্বে সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। সংবিধান থেকে একচুলও তিনি নড়বেন না। অন্যদিকে বিএনপিসহ তাদের জোট/ঘরানার বুর্জোয়া দলগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবীতে অনড়। তারা ২৪ অক্টোবরের পর সংঘাতময় আন্দোলনের হুমকি দিয়ে চলেছে। সরকার একে রাষ্ট্রীয় শক্তি দ্বারা দমনের পাল্টা-হুমকি দিচ্ছে। এই দ্বন্দ্বমান বুর্জোয়া দলগুলো একে অপরকে তৃতীয় শক্তি, ওয়ান-ইলেভেনের ভয়ও দেখাচ্ছে।
বুর্জোয়া সংকট নিরসনে প্রত্যেকেই বলছে ‘গণতন্ত্র’ রায় সংলাপই উত্তম। কিন্তু প্রত্যেকেই আবার তাল গাছটা ছাড়তে নারাজ। দালাল শাসকদের এই মুখোমুখি পরিস্থিতিতে বৈদেশিক প্রভুদের রাতের ঘুম হারাম। তারাও সকল বুর্জোয়া দলগুলোর অংশগ্রহণে ‘অবাধ’ ‘নিরপেক্ষ’ ‘শান্তিপূর্ণ’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য গলদঘর্ম। সাম্রাজ্যবাদের বিশ্ব প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ ফোন করে, বিশেষ দূত পাঠিয়ে, মার্কিন মন্ত্রি চিঠি দিয়ে সংলাপ-সমঝোতার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজিনা বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট রাজনীতিক নেতা বা মুরুব্বীর মত প্রকাশ্যেই কোন রাখ-ঢাক না করে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ-সেমিনারে বক্তৃতা বিবৃতি নসিহত করে চলেছে। দেশের বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী, সুশীলরাও সংলাপ-সমঝোতার, ‘অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ’ নির্বাচনের ফর্মূলা দিয়েই চলেছে।
এই যে শাসক শ্রেণী ও তার বৈদেশিক প্রভুদের ‘অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ’ নির্বাচনের ফর্মূলা তাকি শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ ব্যাপক সাধারণ জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে, নাকি জনগণের শত্রু “ সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ, দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে?
বিগত ৪০ বছর ধরে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে (তা দলীয় সরকারের অধীনেই হোক বা নির্দলীয় তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনেই হোক) তাতে রাষ্ট্রক্ষমতার বড় ভাগটা জনগণের শত্রু শ্রেণীর কোন না কোন গোষ্ঠি দখল করেছে। অর্থাৎ, তারা হলো সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ার বৃহৎ অংশ দুর্নীতিবাজ, রাষ্ট্রীয় ও জনগণের সম্পদ লুটপাটকারী, কমিশনভোগী, কালো টাকার মালিক, ঋণ খেলাপি, সামরিক শাসনের হোতা, সন্ত্রাসী-গডফাদার, কালোবাজারী, ভূমি দস্যূ, মাদক ব্যবসায়ী, নারী পাচারকারী, ধর্মব্যবসায়ী, ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী, রক্ষীবাহিনী-র‌্যাব-সেনাবাহিনী দিয়ে গণহত্যাকারী ও গুমকারী, সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ সৃষ্টিকারী ও রক্ষাকারী গডফাদার, মানবাধিকারবিরোধী, পীরবাদী, জঙ্গীবাদী, সংখ্যালঘু জাতি সত্ত্বার জমি-সম্পদ দখলকারী এবং চরম শ্রমিক-কৃষক বিরোধী নির্মম শোষক (যেমন, গার্মেন্ট মালিক) ব্যক্তিবর্গ।
এই সব গণশত্রুরাই নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করে। শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত শ্রেণী, আদিবাসী জনগণকে শোষণ-শাসন করে। তাদের জমি-সম্পদ দখল করে। তারা গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানী তেল, কৃষি উপকরণ ও নিত্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে কৃষককে সর্বশান্ত করে, শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র জনগণের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত করে তোলে। তারা ও তাদের নিজস্ব লোকেরা অল্প দিনেই আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়। তারা দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ও ভারতীয় প্রভুদের স্বার্থ রক্ষা করে। তারা বিদেশী পণ্য দিয়ে দেশ ছেয়ে ফেলছে। জাতীয় শিল্প ধ্বংস করে বিদেশ নির্ভর শিল্প গড়ে তুলছে। দেশের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানীর হাতে তুলে দিচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিরাপত্তা প্রশ্নে দাসত্বমূলক চুক্তি করছে। তারা উন্নয়নের নামে কৃষি জমি ও পরিবেশ ধ্বংস করছে। শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একদিকে মধ্যযুগীয় প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষা-সংস্কৃতি টিকিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী অপসংস্কৃতি আমদানী করে তরুণ-তরুণীদের কলুষিত করছে। তরুণ প্রজন্মকে মাদকাসক্ত করে বিপথগামী করছে।
এই সব গণবিরোধী কর্মসূচির বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামকে প্রতিটি নির্বাচিত সরকারই দমন-নিপীড়ন চালিয়ে স্তব্ধ করে দিতে চাইছে। সন্ত্রাস দমনের নামে বিপ্লবী, গনতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের হত্যা-নির্যাতন করছে। প্রতিটি সরকারই গনবিরোধী নিত্য নতুন আইন ও বাহিনী বানিয়েছে। বর্তমানের র‌্যাব, ইন্ডিষ্ট্রিয়াল পুলিশ; অতীতের রক্ষীবাহিনী তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় বা নির্দলীয় যে কোন সরকারের অধীনেই হোক না কেন, যে কোন বুর্জোয়া দল বা গোষ্ঠিই মতায় যাক না কেন উপরে আলোচিত গণশত্রুরাই নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করবে, যে সরকার জনগণের মাথায় চড়ে বসবে এবং শোষণ-নিপীড়ন চালাবে।
তাই, শ্রমিক-কৃষক-আদিবাসী ও মধ্যবিত্ত জনগণকে বুর্জোয়া ফর্মূলার বিপরীতে তাদের নিজ নিজ শ্রেণী পেশার স্বার্থের অবস্থান থেকে, সর্বোপরি তাদের নিজেদের রাষ্ট্রমতার অবস্থান থেকে অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পূর্বশর্ত নির্ধারণ করে তার ভিত্তিতে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। জনগণের স্বার্থের গ্যারান্টিপূর্ণ শর্তারোপ করতে হবে। যাতে গণশত্রু শাসক শ্রেণীর স্বরূপ উন্মোচন করা যায়। গণদাবী পূরণের অনুপস্থিতিতে দেশ ও জনগণের শত্রুদের মধ্যকার ক্ষমতা ভাগাভাগির এই বুর্জোয়া প্রহসনমূলক নির্বাচন বয়কট করা জনগণের কর্তব্য হয়ে দাড়াবে।

Posted in আন্দোলন 15 | Leave a comment

রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্রঃ সুন্দরবন ধ্বংস, পরিবেশ বিপর্যয় ও জমি থেকে কৃষক-উচ্ছেদের মহাপরিকল্পনা

আওয়ামী মহাজোট সরকার তার মেয়াদের শেষ লগ্নে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের নামে প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ ধংসকারী এক ঘৃণ্য চক্রান্তে মেতে উঠেছে। সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায় কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষে গত ২৯ জুন, ২০১২ ভারতীয় কোম্পানী এন.টি.পি.সি’র সাথে বাংলাদেশ সরকার এক চুক্তি স্বাক্ষর করে। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সূদূর প্রসারীভাবে পৃথিবীর অন্যতম এ ম্যানগ্রোভ ফরেষ্টের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলবে। নির্মিতব্য তাপভিত্তিক এ প্রকল্প থেকে সুন্দরবনের দুরত্ব মাত্র ১৪ কি.মি.। ইতিমধ্যেই কৃষি ও চিংড়ি চাষের আওতাভুক্ত ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ২৫ বছর আয়ুষ্কালসম্পন্ন ৬৬০ মেগাওয়াট’র দুটি পাওয়ার ইউনিট সম্বলিত এ প্রকল্পের নির্মাণ সময় প্রায় সাড়ে চার বছর। জীব-বৈচিত্র্যে ভরপুর সুন্দরবনের ক্ষয়-ক্ষতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের এ সিদ্ধান্ত ভারত-দালালীর এক নগ্ন প্রতিফলন।
সাধারণভাবেই কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে নির্মাণ পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সংরক্ষিত বনভূমি বা বসতি থেকে ১৫-২০ কি.মি.’র মধ্যে এ ধরনের প্রকল্প আন্তর্জাতিক বুর্জোয়া আইনেই অনুমোদন নেই। অথচ সরকার নিজের দায় এড়াতে নির্মিতব্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র বনের ১০ কি.মি. ক্রিটিক্যাল এরিয়া জোনের বাইরে বলে ঘোষণা দিয়ে এ প্রকল্প জায়েজ করতে চাচ্ছে। এমনকি খোদ ভারত সরকারও তাদের দেশে ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন অ্যাক্ট অনুযায়ী জীব বৈচিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, বাঘ/হাতি বা অন্য কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল সংলগ্ন ২৫ কি.মি.ব্যাসার্ধের মধ্যে এ ধরনের প্রকল্পের অনুমোদন দেয় না। দেশীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ভারতের সাথে সরকারের সম্পাদিত এ চুক্তি অতীতের ন্যায় বিদ্যুত (রেন্টাল/কুইক রেন্টাল) ন্যায় গোষ্ঠিগত হীন স্বার্থ সিদ্ধিরই পায়তারা।
সুন্দরবনের মত স্পর্শকাতর স্থানে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ সমগ্র সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্রের জন্য এক বড় ধরনের হুমকি বয়ে আনবে। নির্মাণ ও নির্মাণ পরবর্তী বিদ্যুৎ উৎপাদনকালীন সময়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ১০ কি.মি. ব্যাসার্ধের মধ্যে পরিবেশ-কৃষি-মৎস্য ও পানি সম্পদের উপর এর ক্ষতিকর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদী। প্রতিদিন প্রকল্প থেকে নির্গত হবে ১৪২ টন সালফার ডাই অক্সাইড এবং ৮৫ টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড। সুন্দরবনের মত সংরতি বনাঞ্চলের জন্য যেখানে বাতাসে এর সর্বোচ্চ মাত্রা ৩০ মাইক্রো গ্রাম, বর্তমানে যার মাত্রা ৮, সেখানে বাতাসে সালফার ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব দাড়াবে যথাক্রমে ৫৩.৪ মাইক্রোগ্রাম ও ৫১.২ মাইক্রোগ্রাম। বাতাসে বিপুল পরিমাণ এই বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে গোটা সুন্দরবন ধ্বংসের মুখে পড়বে। সরকার এখানেও শঠতার আশ্রয় নিয়েছে। সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল বা স্পর্শকাতর অঞ্চলের মানদন্ডে না দেখিয়ে বসতি অঞ্চলের মানদন্ডে বিচার করেছে। পাশাপাশি কয়লা পোড়ানোর ফলে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণও বাড়বে। এ ছাড়া চিমনী থেকে নির্গত ছাই ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে। এতে মিশে থাকা বিষাক্ত ধাতু আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ক্যাডম্মিয়াম, রেডিয়াম প্রভৃতি, যা প্রাণ-পরিবেশের জন্য এক বড় ধরনের হুমকি। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ই.আই.এ রিপোর্ট অনুসারে প্রকল্প এলাকার ৯৫ শতাংশ ও চারপাশের ১০ কি.মি. ব্যাসার্ধের মধ্যে ৭৫ শতাংশই কৃষি জমি। প্রকল্প ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ধান উৎপাদন হয় বছরে ৬৩,৬৩৮ টন এবং অন্যান্য ফসল ১,৪০,৪৬১ টন, মৎস্য উৎপাদন হয় প্রায় ৫,৭৮৮ টন। এ ছাড়া বসত বাড়ির পশু-পাখিতো আছেই। কাজ শুরু হলেই প্রকল্পাধীন অঞ্চলে ধান, অন্যান্য ফসল এবং মাছের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। জাহাজে যন্ত্রপাতি আনা-নেয়া, কয়লা পরিবহন, কয়লা নামানো-উঠানোতে পানি দূষণ ও পানির উষ্ণতা মাত্রাতিরিক্ত বাড়বে। কয়লার গুড়া, ভাঙা কয়লা ও জাহাজের বিপুল বর্জ্য ও তেল পানিতে নিঃসৃত হবে। জালের মত বিছিয়ে থাকা খাল এবং নদীগুলোর স্বাদু ও লোনা পানি, যা মাছের সমৃদ্ধ ভান্ডার বলে পরিচিত, হুমকির মুখে পড়বে। তা ছাড়া কয়লা পোড়ানো বর্জ্য, ছাই প্রকল্প এলাকায় ভরাট করা হলে বৃষ্টির পানির সাথে মিশে-চুইয়ে উক্ত এলাকার মাটি ও মাটির নীচের পানির স্তর দূষিত করবে। যা প্রকল্প এলাকায়ই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় খাদ্য ঘাটতি সৃষ্টি হবে। মাছের যোগান অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধাতব যন্ত্রপাতি ও প্রতিনিয়ত জাহাজ আসা-যাওয়ার ফলে যে উচ্চ শব্দের সৃষ্টি হবে তাতে বনের শান্ত পরিবেশ বিঘ্ন হবে। রাতে জাহাজের সার্চ লাইটের ব্যবহার প্রাণীকুলের অবাধ বিচরণকে বাধাগ্রস্থ করবে। সুন্দরবনের ইকো-সিস্টেম ভেঙে পড়বে। সার্বিকভাবে মাটি-পানি-বায়ু দূষণের ফলে অদুর ভবিষ্যতে অরণ্য অঞ্চল বলে পরিচিত সুন্দরবনের নাম-নিশানা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। পশু-পাখি হয় মারা যাবে, নতুবা অস্তিত্ব রার্থে কিছু ভারতে অবস্থিত সুন্দরবনে চলে গিয়ে আশ্রয় নিবে। ‘জলে কুমির, ডাঙ্গায় বাঘ’ বলে পরিচিত সুন্দরবন লোক কথায় পরিণত হবে। বাংলাদেশের গর্ব রয়েল বেঙ্গল টাইগারের স্থান হবে প্রাণী জাদুঘরে।
এ সব ক্ষয়-ক্ষতি জানা সত্ত্বেও হাসিনা সরকার রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বদ্ধপরিকর। জনগণের প্রতিবাদ-প্রতিরোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের “বন্ধু প্রতিম” ভারতীয়দের স্বার্থ রক্ষায় তারা মরীয়া হয়ে উঠেছে। যা থেকে গুটিকয় কমিশনভোগী মন্ত্রী, আমলা, বিশেষজ্ঞও বড় ধরনের অর্থ পাবে। প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমাণ আত্মসাৎ ছাড়াও সামনে নির্বাচনকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ ভারতের নিরঙ্কুশ সমর্থন পেতে চায়। তারই ভেট হিসেবে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে হাসিনা সরকারের এত তোড়-জোর। অপরদিকে ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে বিভোর বিএনপি’র নেতৃত্বে ১৮-দলীয় জোট নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের কট্টর বিরোধী অবস্থান নিলেও রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণসহ সকল দেশ ও গণবিরোধী কর্মসূচি প্রশ্নে নীরব। শাসক শ্রেণীর সরকারি বা বিরোধী দল নিজেদের গোষ্ঠিগত ভাগ-বাটোয়ারা বা ক্ষমতার টিকিট নিয়ে দ্বন্দ্ব করলেও উভয়ই নির্বাচনে ভারতের আশীর্বাদের প্রত্যাশী। তাই, বিরোধী দলের এই নীরবতা।
তাই সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংসের এই গণবিরোধী প্রকল্প রুখতে দেশের বিপ্লবী, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক, পরিবেশবাদী সংগঠন, শক্তি ও ব্যক্তিদের ঐক্যবদ্ধভাবে কৃষক-শ্রমিক ও সাধারণ জনগণকে নেতৃত্ব দিতে হবে। জনগণের উপর চেপে বসা সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দাসানুদাসরা যত দিন রাষ্ট্রমতায় থাকবে ততদিন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ, জাতীয় সম্পদ থেকে শুরু করে জনগণের জান-মাল কোনটাই নিরাপদ নয়। এই গণবিরোধী শাসকশ্রেণী ও তাদের প্রভুদের বিতাড়িত করে গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শুধু পরিবেশ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা যেতে পারে।

[বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জন্য প্রতি ঘন্টায় পশুর নদী থেকে ৯,১৫০ ঘনমিটার পানি প্রত্যাহার করতে হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি শীতলকরণসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের পর ৫,১৫০ ঘনমিটার পানি আবার নদীতে ফেরত আনা হবে। ঘন্টায় প্রায় ৪ হাজার ঘনমিটার পানির প্রবাহ কমবে। তার মানে প্রতিদিন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যদি ২০ঘন্টা উৎপাদনে থাকে, তাহলে প্রতিদিন ৮০ হাজার ঘনমিটার পানির প্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই নস্ট হবে। এ হিসাবটাও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৯৯৫ সালে নেয়া। পশুর নদীর বর্তমান পানির প্রভাব হিসাব করলে এ হিসাবের অংকটা অনেক উচু হবে। (সৌজন্যে হাসান কামরুল/যুগান্তর)]

Posted in আন্দোলন 15 | Leave a comment

শ্রমিক আন্দোলন থেকে বুর্জোয়া ‘শ্রমিক নেতা’দের উচ্ছেদ ব্যতীত শ্রমিকশ্রেণীর কোন মঙ্গল হতে পারে না

গত ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৩-এ ঢাকার সোরওয়ার্দী উদ্যানে নৌ-মন্ত্রি শাহজাহান খানের নেতৃত্বে গার্মেন্ট শ্রমিকদের এক সমাবেশ হয়ে গেল। গার্মেন্ট শ্রমিকদের ৫২টি সংগঠনের মাঝে ২০টির বেশি সংগঠন এই সমাবেশে যোগ দিয়েছে বলে দাবী করা হয়েছে। মহাজোট সরকারের শরীক তথাকথিত বাম পার্টিগুলোর শ্রমিক সংগঠন এবং এনজিও দ্বারা গঠিত শ্রমিক সংগঠনগুলো এ সমাবেশে যোগ দিয়েছে। আর এই সংগঠনগুলোর সমন্বয় পরিষদের আহবায়ক বানানো হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রি শাহজাহান খানকে। এতদিন মাদারীপুর জেলার সন্ত্রাসী গডফাদার, পরিবহন মালিক এই বুর্জোয়া নেতা ছিলেন পরিবহন ‘শ্রমিক নেতা’। পরিবহন শ্রমিক নেতা হয়ে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনকে বুর্জোয়া রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার, চাঁদাবাজী আর সন্ত্রাসসহ শ্রমিক শ্রেণীর একটি অংশকে অধঃপতিত ও কলুষিত করা এবং নিজে বিপুল অর্থ বিত্ত হাতিয়ে নেওয়ার কাজে সে বিশেষ সফলতা দেখিয়েছিল। এবার নৌ মন্ত্রী হয়ে নৌ-শ্রমিকদের উপরেও সে ছড়ি ঘুরিয়েছে। আর এখন রাতারাতি গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা বনে গেছে। এর রহস্য কি?
বহু শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে মূলত নিষিদ্ধ। মালিকরা শ্রমিকদের কেউ ট্রেড ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার বিষয় জানতে পারলে তাদের চাকরী থেকে ছাঁটাই করে। তা সত্বেও বাম সংগঠনগুলো বা এনজিওগুলো গার্মেন্ট শ্রমিকদের কিছু কিছু ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলেছে। সাভারে রানা প্লাজা ধসে শত শত শ্রমিক নিহত, আহত ও নিখোঁজ হওয়ায় দেশে বিদেশে গার্মেন্টসগুলোতে ট্রেড ইউনিয়নসহ বিভিন্ন শ্রমিক অধিকারের অভাব নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। শ্রমিকরাও ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরীর দাবীতে প্রায় প্রতিদিন বিক্ষোভ করছেন। মালিকরা মাত্র ৬০০ টাকা বাড়িয়ে ৩৬০০ টাকা ন্যূনতম মজুরী দেয়ার প্রস্তাব করেছে। এর প্রতিবাদে শ্রমিক শ্রেণী বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। এই বিক্ষোভকে হাসিনা সরকার পুলিশ বাহিনী দিয়ে নির্মমভাবে দমন করছে।
শ্রমিক আন্দোলনের এই পরিস্থিতি মহাজোট সরকার ও আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের সামনে বিপদে ফেলেছে। ভোটের জন্য এই শ্রমিকদের পক্ষো রাখা দরকার। তার চেয়ে বেশি দরকার গার্মেন্ট মালিকদের সমর্থন আর টাকা। কার্যত আওয়ামী লীগের নেতাদের অর্ধেক নিজেরাই গার্মেন্ট মালিক। এই অবস্থায় শ্রমিক-মালিক উভয়কে হাতে রাখার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে চক্রান্তমূলকভাবে নৌ-পরিবহন মন্ত্রি শাহজাহান খানকে দিয়ে ২১ সেপ্টেম্বর গার্মেন্ট শ্রমিকদের মহাসমাবেশ ডাকে।
শাহজাহান খান নিজে হচ্ছে বুর্জোয়া। পরিবহন মালিক। রাজনৈতিকভাবে সে বুর্জোয়া পার্টির লোক। শ্রমিক নেতার নামে সে হলো মালিক শ্রেণীর প্রতিনিধি। সুতরাং সে হলো ছাগলের ছাল গায়ে নেকড়ে। গত ৫ বছর ধরে সে আওয়ামী মহাজোট সরকারের মন্ত্রি। যে সরকারের মন্ত্রিসভা ২২ এপ্রিল, ২০১৩ “শ্রম আইন ২০০৬”-এর সংশোধনী প্রস্তাব নীতিগতভাবে গ্রহণ করেছে, যা শ্রমিক স্বার্থ এবং শ্রমিক সংগঠন বিরোধী। যে শ্রম আইন বাতিলের দাবী বাম ধারার শ্রমিক সংগঠনগুলো করে আসছে। যে সরকার শ্রমিক দমনের জন্য ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পুলিশ গঠন করেছে। যে সরকার শ্রমিকদের প্রতিটি ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে পুলিশ-র‌্যাব লেলিয়ে দিয়ে নির্মমভাবে দমন করছে। যে সরকার শ্রমিকদের প্রতিটি আন্দোলনকে বহিরাগত ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করে মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করছে। সে সরকারের মন্ত্রি আজ গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা সেজে শ্রমিকদের সমাবেশ ডেকে এক নতুন ষড়যন্ত্রের শুরু করেছে।
এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে মহাজোট সরকার ও আওয়ামী লীগ তাদের দুটি লক্ষ্য হাসিল করতে চাচ্ছে। এক) সমাবেশে শ্রমিকদের দাবির কিছু হাওয়াই কথা বলে এবং হাসিনাকে দিয়ে শ্রমিক মজুরীর কিছু বৃদ্ধি ঘোষণা করে আসন্ন নির্বাচনে তাদের পক্ষে ৪০ লক্ষ গার্মেন্ট শ্রমিকদের সমর্থন টেনে আনা; দুই) দুর্বার গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দখল করে তাকে পথভ্রষ্ট করা, তাকে বিভ্রান্ত করা, তাকে আপোষের পথে ঠেলে দেয়া, মালিকদের কাছে গ্রহণীয় কিছূ খুদ-কুড়া মজুরী বৃদ্ধি শ্রমিকদের দিয়ে গেলানো। যা বুর্জোয়া দলগুলো সর্বদাই এবং সব শ্রমিক সংগঠনের ক্ষেত্রে করে থাকে। এই শ্রমিক নেতা সোরওয়ার্দী উদ্যানে হেফাজতের তেঁতুল তত্ত্বের বিরোধিতা করার অজুহাতে আওয়ামী রাজনীতি শ্রমিকদের মাথায় চালান করতে চেয়েছে। সে মন্ত্রিসভায় গৃহীত শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী আইনের বিরোধিতা করেনি। এমনকি জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলনকে দমনের হুমকিও প্রদর্শন করছে।
কিন্তু এই সমাবেশ তাদের জন্য কিছুটা বুমেরাং হয়ে গেছে। শ্রমিক শ্রেণী তাদের ৮ হাজার টাকার দাবি আরো জোরে শোরে তুলেছে। তাদেরকে বাগে আনা সম্ভব হয়নি বুর্জোয়া ও তথাকথিত বাম নেতাদের পক্ষে। ফলে গার্মেন্টস মালিকরা পর্যন্ত খানের উপর ক্ষেপে গেছে। মালিকদের ধমক খেয়ে এই ভন্ড শ্রমিক দরদী খান এখন সরাসরি শ্রমিকদের আন্দোলনের বিরুদ্ধাচরণ করছে। যারা আন্দোলন করবে তারা সন্ত্রাসী এমন হুমকিও দিয়েছে।
তাই, শ্রমিকশ্রেণীকে শ্রেণী সচেতন হবার তাগিদ অনুভব করতে হবে। কোন বুর্জোয়া পার্টি, সংগঠন ও ব্যক্তির পক্ষে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়। বুর্জোয়া পার্টির নেতা-নেত্রীরা শ্রমিক শ্রেণীর নেতা হতে পারে না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামাতসহ অন্যান্য বুর্জোয়া দলগুলো শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা মালিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিটি বুর্জোয়া সরকারই দমন নিপীড়ন চালায়। শ্রমিকদের জীবন-সংগ্রাম দিয়েই তা উপলব্ধি করা সম্ভব। শ্রমিক শ্রেণীকে শাহজাহান খানদের মত বুর্জোয়া নেতাদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে। শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতির ভিত্তিতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে হবে। তা না হলে তাদের রক্ত ও ঘাম ঝরানো আন্দোলন ব্যর্থ হবে, তাদের মাঝে মালিকের ভাড়াটিয়ারা আসন গাড়বে, তাদের মুক্তি হবে সূদুর পরাহত।

Posted in আন্দোলন 15 | Leave a comment

গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি প্রসঙ্গে

গার্মেন্ট শ্রমিকরা বর্তমানে ন্যূনতম মজুরী ৮,০০০ টাকার দাবীতে আন্দোলন করছেন। বুর্জোয়া শাসকদের স্বীকৃত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই শ্রমিকদের জীবন-যাপন যে মধ্যযুগীয় দাসদের হার মানিয়েছে তা দেশের বিপ্লবী, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল পার্টি, সংগঠন, শক্তি, ব্যক্তি, এমনকি বুর্জোয়া মানবাধিকারবাদী এবং সাংবাদিকগণও হরহামেশাই লেখালেখি করে আসছেন। রানা প্লাজা ধসে ১১শ’র অধিক শ্রমিকের মৃত্যু এবং শত শত শ্রমিকের নিখোঁজের ঘটনায় গার্মেন্টের পরিবেশ নিয়ে দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় উঠলে শেখ হাসিনা সরকার দ্রুত মজুরী বোর্ড গঠন করে। এবং তিন মাসের মধ্যে নতুন মজুরী ঘোষণা করা হবে বলে প্রচার দেয়। কিন্তু প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও শ্রমিকদের দাবী অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরী আলোর মুখ এখনও দেখেনি। মধ্যে দুটো ঈদ পড়ে যাওয়ার কারণে মালিকদেরকে বর্ধিত ঈদ বোনাস থেকে বাঁচানোর জন্যও-যে সরকার এই গড়িমসি করেছে তাও বলাই বাহুল্য। বহু টালবাহানা করে অবশেষে সেপ্টেম্বর মাসে গার্মেন্ট মালিকরা বলেছে আগের মজুরীর সাথে আর মাত্র ৬০০/- টাকা যোগ করে তারা ন্যূনতম মজুরী দেবে ৩,৬০০ টাকা। মালিক শ্রেণীর এই সরকার ২০১০ সালে গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী ৫ থেকে ৭ হাজার টাকার দাবীর প্রেক্ষিতে করেছিল মাত্র ৩ হাজার টাকা। বিগত তিন বছরে দ্রব্যমূল্য, বাড়ী ভাড়া, পরিবহন ভাড়া বেড়েছে কয়েক গুণ। কিন্তু শ্রমিকরা মরিয়া আন্দোলনে নামার আগ পর্যন্ত সরকার তাদের মজুরী বৃদ্ধির বিষয়ে টু শব্দটি করেনি। অন্যদিকে তারা রাস্তার পাশে বিলবোর্ড টানিয়ে শ্রমিকদের জীবন-মান উন্নয়নের মিথ্যা বাগাড়ম্বর করছে। বর্তমানেও শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী বৃদ্ধির ন্যায্য আন্দোলনকে সরকার র‌্যাব-পুলিশ লেলিয়ে নির্মমভাবে দমন করছে।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী কি হওয়া উচিত? মালিক পক্ষ শ্রমিকদের দাবী মানতে চাচ্ছে না। তারা বলছে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কোন মূল্য বৃদ্ধি করছে না। উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাই তারা মজুরী ৬০০ টাকার বেশী বৃদ্ধি করতে পারবে না। এর বেশী করলে তাদের লস হবে। কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। তাতে দেশের ক্ষতি হবে, শ্রমিকরাই বেকার হবে, তাই শ্রমিকদের আন্দোলন করা উচিত নয় ইত্যাদি। এসব কথা যে অতি মুনাফালোভী গার্মেন্টস মালিকদের কুযুক্তি সেটা এই সরল তথ্য থেকেই প্রমাণিত হবে যে, গার্মেন্ট ব্যবসা করে এদেশে কেউ লস খায়নি। বরং একটি গার্মেন্ট দিয়ে শুরু করে মাত্র কয়েক বছরেই দুই/চার/দশটি গার্মেন্টেস কোম্পানীর মালিক হয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে এই মালিকরা। দেশের আর দশটি শ্রম-ক্ষেত্রে, যেখানে উৎপাদনশীলতা অনেক কম সেগুলোতেও শ্রমিকের মজুরীর সাথে তুলনা করলে এ সত্যটি প্রমাণিত হবে। বর্তমান সরকার, আগের সব সরকারগুলোর মতই, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মালিকদের এইসব কুযুক্তিকেই তুলে ধরে শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার জন্য।
অবশ্য শ্রমিক আন্দোলনের ফলে এখন মালিকরা বলছে মজুরী বোর্ড যে সিদ্ধান্ত দিবে তারা তা মেনে নিবে। সরকার বলছে নভেম্বরে তারা নিুতম মজুরী ঘোষণা করবে। মালিকরা জানে যে, সরকার তাদেরই স্বার্থরাকারী। আর মজুরী বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে যারা রয়েছে সেই শাহজাহান খানের মত বুর্জোয়া শ্রমিক নেতারা শ্রমিক আন্দোলনে বুর্জোয়াদেরই প্রতিনিধিত্ব করে। তারা শ্রমিকদেরকে সরকারী সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ঠান্ডা করবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাই, মালিকরা সরকারের উপর আস্থাশীল যে, সরকার মালিকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেবে না।
* অন্যান্য পণ্যের মত শ্রম শক্তিও একটি পণ্য। শ্রম শক্তির মূল্য শ্রম শক্তির উৎপাদনের ব্যয়ের উপর নির্ভরশীল। শ্রম শক্তি উৎপাদনের ব্যয় কিভাবে নির্ধারণ করা হয়? মজুরকে মজুর হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা এবং মজুরদের যোগান অব্যাহত রাখার জন্য যে খরচ হয় তা হলো শ্রম শক্তির উৎপাদন ব্যয়। তাই মজুরের শ্রমের দাম তার জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম দ্বারা নির্ধারিত হয়। মালিক যেমন তার উৎপাদিত মূল্য নির্ধারণের সময় কলকব্জার ক্ষয়প্রাপ্ত হিসাবটা করে মূল্যের সাথে তার সংযোজন করে, যাতে সে অর্থ দিয়ে ১০ বছর পরে নতুন কলকব্জা ক্রয় করতে পারে। এ কারণেই কার্ল মার্কস বলেছেন “ঠিক এই ভাবেই সাধারণ শ্রম শক্তির উৎপাদনের ব্যয় হিসেব করার সময় তার সঙ্গে ধরতে হবে বংশবৃদ্ধির খরচ, যাতে করে মজুরের জাত বেড়ে চলে, জীর্ণ মজুরের জায়গায় নতুন মজুর জায়গা নিতে পারে। এই ভাবে যন্ত্রপাতির ক্ষয়তির মত মজুরের ক্ষতি হিসেবে ধরা হয়। সুতরাং সাধারণ শ্রমশক্তির উৎপাদন ব্যয় হল মজুরের জীবন ধারণ ও বংশ রক্ষার খরচের সমান। এই জীবন ধারণ এবং বংশ রক্ষার খরচের মূল্য হলো মজুরী। এইভাবে নিরুপিত মজুরীকে ন্যূনতম মজুরী বলা হয়।” (কার্ল মার্কস; মজুরী শ্রম ও পুঁজি; ১৮৪৯)
তাই, আজকের বাজার দরে একটি শ্র্মিক পরিবার চলতে কত টাকা খরচ হয় তার হিসেব দরকার। স্বামী-স্ত্রী ও নিম্নতম দুই সন্তানের সাথে পিতা-মাতাদের অন্তত একজনকে যুক্ত করলে মোটামুটি পাঁচ জনের একটি পরিবারকে ধরা যেতে পারে। তাদের মাসিক খরচ কত সেটাই হতে হবে সেই পরিবারের উৎপাদন শ্রমে অংশগ্রহণকারী সদস্যদের মোট নিম্নতম মজুরী। সাধারণত পরিবার পিছু দুই জনকে যদি উৎপাদন কাজে যুক্ত ধরা হয় তাহলে পরিবারের মোট প্রয়োজনের অর্ধেক হতে পারে একজন শ্রমিকের নিম্নতম মজুরী। এর নিচে কোন মজুরী কোন ক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু তাই নয়, যেহেতু স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই শ্রমিক হিসেবে ধরা হতে পারে, তাই, সন্তানদের প্রতিপালন খরচও মালিককে নিতে হবে। এছাড়া তাদের লেখাপড়া, খেলাধুলা, সদস্যদের স্বাস্থ্য চিকিৎসা, বিনোদন এবং সর্বোপরি বাসস্থানের ব্যবস্থা অবশ্যই রাষ্ট্র ও/বা মালিককে নিতে হবে, যদি একটি ন্যায্য মজুরী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এমনকি পাকিস্তান আমলেও পাট শিল্প ও টেক্সটাইল শিল্প গুলোতে উপরোক্ত সুবিধাগুলো কিছুটা পরিমাণে হলেও মালিকরা বহন করতো। কেউ দাবি করতে পারে না যে, পাকিস্তান আমল থেকে এখন গার্মেন্টসগুলোতে মুনাফা কম হচ্ছে। অথচ, প্রাইভেটাইজেশনের জোয়ারে এখন প্রতিটি প্রয়োজনই মেটাতে হয় শ্রমিককে তার মজুরী থেকে। বেতন বাড়ার সাথে সাথে সবচেয়ে বেশি হামলে পড়ে বাড়ীওয়ালারা। লাভের গুড় পিপড়ায় খায়। আর দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকে হু হু করে। এবারও, মজুরী যতটাই বাড়–ক না কেন, এটাই ঘটবে। তাই, প্রতিবছরই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে মজুরীকে সমন্বয় না করলে টাকায় মজুরী বৃদ্ধি একটি হাওয়াই মিঠাই-এ পরিণত হতে বাধ্য। তাই, শুধু নিম্নতম মজুরী নির্ধারণই যথেষ্ট নয়, তার সাথে এই সমস্ত বিষয়গুলো যুক্ত করলেই মাত্র শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরী বৃদ্ধি ফলপ্রসূ হতে পারে। নতুবা শ্রমিকের জীবনে খুব কমই উন্নতি ঘটবে।
উপরের হিসেবে একটি পরিবারের মাসিক খরচ কত, আর শ্রমিকের নিম্নতম মজুরী কত হওয়া উচিত তা নিয়ে প্রগতিশীলদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। অনেকে ১৬, ১৮ বা ২০ হাজার টাকা মজুরীর কথা বলছেন। এই হিসেব ভুল নয়, তবে কতটা বাস্তব সেটা বিবেচনা করতে হবে। এই বিবেচনার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে আমাদের দেশে বিভিন্ন শ্রমক্ষেত্রে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা, শ্রমিকের জীবনযাপন পরিস্থিতি, বেকারত্ব পরিস্থিতি, অন্যান্য শ্রমক্ষেত্রে মজুরী কাঠামোর পরিস্থিতি প্রভৃতিকেও।
পরিবারপিছু গড়ে দুইজনকে উৎপাদনক্ষম ধরলে মজুরী ৮ হাজার টাকার যে দাবী শ্রমিকরা তুলেছেন তাকে যুক্তিযুক্ত বলা যাবে। আমাদের সংগঠন বহু আগে থেকেই নিম্নতম ৫ মণ চালের মূল্যের সমান মজুরী দাবী করেছিল এই বিবেচনা থেকেই। এতে আরো গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল দ্রব্যমূল্য (বাড়ীভাড়াসহ) বৃদ্ধি যে আমাদের দেশে সাধারণত চালের দামের সাথে মোটামুটি সামঞ্জস্য রেখে বৃদ্ধি পায় এই বিষয়টিকে। তবে বর্তমানে শাসক শ্রেণী চালের দাম কম রেখে আর বাকী সবকিছুর দাম বৃদ্ধির যে অর্থনীতি চালাচ্ছে তাতে এই হিসেবেও কিছু সমস্যা হয়। তথাপি সরকার, মালিক ও শ্রমিকের কাছে এটা পরিস্কার থাকে যে, চালের দাম (সাথে সাথে অন্য সব দ্রব্যমূল্য) বাড়লে তাদের মজুরীও বাড়তে হবে। নতুবা টাকার অঙ্কে কোন মজুরীই কয়েকদিন পর শ্রমিকের প্রয়োজন মিটাতে সক্ষম হবে না।
শ্রমিক শ্রেণী আজ যে ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ তুলেছেন ৮ হাজার টাকা নিম্নতম মজুরীর, তাকে আমরা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করি। সেই সাথে যুক্ত করতে বলি এই দাবি যে, অবশ্যই নিম্নতম মজুরীকে প্রতি বছর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে সমন্বয় করতে হবে। বিশেষভাবে বাড়ীওয়ালারা যেন শ্রমিকের মজুরী বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়িভাড়া বাড়াতে না পারে সেজন্য রাষ্ট্রীয় আইনগত সুরা থাকতে হবে। একইসাথে মালিক/সরকারের যৌথ উদ্যোগে শ্রমিকের জন্য স্বল্পমূল্যের বাসস্থান করতে হবে এবং এরকম কোন বাসস্থানের নিম্নতম ব্যবস্থা ছাড়া কোন কারখানা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। পাশাপাশি শ্রমিক পরিবারের জন্য হাসপাতাল, ডে কেয়ার সেন্টার, স্কুল, খেলাধুলা আর বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব কিছু মিলিয়েই নিুতম মজুরীর আন্দোলনকে দেখতে ও পরিচালনা করতে হবে।

শ্রমিক আন্দোলন থেকে বুর্জোয়া ‘শ্রমিক নেতা’দের উচ্ছেদ ব্যতীত
শ্রমিকশ্রেণীর কোন মঙ্গল হতে পারে না

পোশাক শিল্পে মজুরি সর্বনিম্ন

মালিকরা দাবি করে সর্বনিম্ন মজুরি বাড়ালে তারা লস খাবে। অথচ পোশাক শিল্প খাতই হলো বর্তমানে বাংলাদেশে সবচাইতে লাভজনক খাত। এর চেয়ে কম লাভজনক খাতগুলোতে নিম্নতম মজুরির সাথে তুলনা করলে বোঝা সম্ভব গার্মেন্টস মালিকদের দাবি কতটা মিথ্যা এবং তারা কত বেশি পরিমাণ লাভ করে।
× নির্মাণশিল্প ৯,৮৮২/-
× ট্যানারী শিল্প ৯,৩০০/-
× তেল মিল ৭,৪২০/-
× ব্যক্তিমালিকানাধীন সড়ক পরিবহন ৬,৩০০/-
× রি-রোলিং মিল ৬,১০০/-
× কোল্ড স্টোরেজ ৬,০৫০/-
× গ্লাস ৫,৩০০/-
× চাতাল ৭,১৪০/-

এখানে উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত অনেক শিল্পেই শ্রমিকেরা বাড়িতে থেকে, গ্রামে থেকে কাজ করেন। ফলে ঢাকা বা নগরগুলোর চেয়ে তাদের খরচ কম, বিশেষত বাসা ভাড়া যাদের লাগে না। সে ক্ষেত্রে গার্মেন্টস শ্রমিকরা বড় নগরে থাকায় তাদের খরচ বেশি। অথচ সর্বনিম্ন মজুরি সবচেয়ে কম ৩,০০০/-। (প্রথম আলো’র সৌজন্যে)

Posted in আন্দোলন 15 | Leave a comment

৮ হাজার টাকা নিম্নতম মজুরির দাবিতে গার্মেন্টস-শ্রমিক উত্থান

৮ হাজার টাকা নিম্নতম মজুরীর দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকের আন্দোলনে পুনরায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী, নারায়নগঞ্জসহ গার্মেন্টস শিল্প পাড়াগুলো। হাজার হাজার শ্রমিক তাদের এই ন্যায্য দাবীতে প্রায় প্রতিদিন আন্দোলন করেছেন, এখনও করছেন, আরো করবেন। পৃথিবীর প্রায় সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও বহু কথনে পটু প্রধানমন্ত্রি আন্দোলনের আগে আগে একবার মাত্র ঘোষনা করেছিলেন যে, তারা আবার গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরী বাড়াবেন; কিন্তু তার পর থেকে তিনিও মুখে এ বিষয়ে এমন কুলুপ এঁটে দিয়েছেন যে, বোঝাই যাচ্ছে তিনি ও তার সরকার কী মহা বিপদেই না পড়েছেন। এখন ভোটের আগে ৪০ লাখ শ্রমিকের এই খাতকে অসন্তুষ্ট করলে তার ভোটের বাক্সে টান পড়বে সেটা এই ভোট বিশারদ ভাল করেই জানেন। আর অন্যদিকে গার্মেন্টেসের মালিকেরা, যারা তার নিজ ঘরেরই লোক, যাদের টাকায় তার পার্টি চলে, যারা তার পার্টির মন্ত্রী এমপি, তাদের টাকার থলিতে টান দেয়াকেও মেনে নেয়া যায় না। এ অবস্থায় শ্রমিক আন্দোলনের পিঠে ছুরি মারায় ওস্তাদ, পরিবহন মালিক ও পরিবহন চাঁদাবাজ মন্ত্রী শাহজাহান খানকে মাঠে নামিয়েও রক্ষা হয়নি। শ্রমিকেরা ৮ হাজার টাকার দাবী শিখে গেছেন। তাই, আসল হাতিয়ার পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি নামিয়েছেন। আর ঘোষণা দিয়েছেন নভেম্বরে মজুরী কাঠামো জানাবেন।
শ্রমিক শ্রেণীর নিম্নতম মজুরী ৮ হাজার টাকাও কোনক্রমেই পূর্ণ দাবি নয়। কারণ, মজুরী বাড়লেই বাসাভাড়া বেড়ে যাবে। দ্রব্যমূল্য এখনি আকাশ ছোঁয়া, তা আরো বাড়বে। শ্রমিকের বাসস্থান, চিকিৎসা, বিনোদন, ট্রেড ইউনিয়ন ও রাজনীতি করবার অধিকার, সন্তানদের লেখাপড়া, খেলাধুলা, প্রতিপালনের ব্যবস্থার দাবিও জানাতে হবে। অথচ এখনও শ্রমিককে বকেয়া বেতন, ওভারটাইম, আন্দোলন করলেই ছাটাই, এমনকি শারিরীক নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে।
এসব যেন শ্রমিক শ্রেণী ভালভাবে না বোঝেন ও আন্দোলনকে আপোষহীনভাবে না চালান সেজন্য রয়েছে মালিক সংগঠন, বুর্জোয়া দলগুলো, বুর্জোয়া সুশীল সমাজ, তাদের মিডিয়া এবং পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি ছাড়াও বুর্জোয়া দলীয় মাস্তান বাহিনী। তারা শ্রমিক আন্দোলনে বিভ্রান্তি, বিভক্তি, ষড়যন্ত্র, অন্তর্ঘাত করার জন্য শ্রমিকের আন্দোলনে বুর্জোয়া রাজনীতি ও বুর্জোয়া নেতাদের ঢুকিয়ে রাখে। তাদেরকে উচ্ছেদ ছাড়া শ্রমিক শ্রেণীর দাবীগুলোও ভালভাবে আদায় হতে পারে না।
এমনকি ৮ হাজার টাকার দাবি আদায় হলেও দুদিন পরই তা আজকের ৩ হাজারের সমমানের হয়ে যাবে। পুঁজিবাদে এটাই হয়ে আসছে ও হবে। তবুও শ্রমিককে এইসব দাবির জন্য আন্দোলন করতেই হবে। কিন্তু তাদেরকে বুঝতে হবে যে, পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ সারা দুনিয়ায় যা করছে, এখানেও তাই করবে। শ্রমিক শোষিত হতেই থাকবেন, মালিকের পকেট ভরতেই থাকবে, যতদিন বুর্জোয়া ব্যবস্থা অর্থাৎ পুঁজিবাদ থাকবে। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সমাজতন্ত্র, যা শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতির মাধ্যমেই শুধু হতে পারে। সমাজতন্ত্র হলো শ্রমিক রাজ; যাতে তাদের সাথে থাকবে কৃষকরাসহ অন্য সকল শ্রমজীবীরাও। এই বিপ্লবী ও শ্রমিক শ্রেণীর রাজনীতিতে শ্রমিক শ্রেণীকে শিক্ষিত হয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামাতসহ সকল পদের বুর্জোয়া রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে শ্রমিক বিপ্লবের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে হবে। আর আশু আন্দোলনগুলোকে এই রাজনীতির অধীনেই চালাতে হবে। তাহলেই শ্রমিক শ্রেণী আশু দাবী আদায় করতে যেমন সক্ষম হবে, তেমনি চূড়ান্ত মুক্তির পথেও এগোতে সক্ষম হবে।

Posted in আন্দোলন 15 | Leave a comment

ধর্মীয় মৌলবাদকে কেন বিরোধিতা করতে হবে এবং কীভাবে করতে হবে?

বিগত দুই দশক ধরেই ইসলামী মৌলবাদী শক্তিগুলো বারে বারে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ড.আহমদ শরীফকে মুরতাদ ঘোষণা করে তার ফাঁসির দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলা, তসলিমা নাসরিনকে দেশছাড়া করা, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন গড়া ছাড়াও বিশ্বপরিস্থিতির সাথে যুক্তভাবে এই শক্তিগুলো আহমদ রুশদী, ইসলামের নবীর অবমাননা, ছবি নির্মাণ ইত্যাকার বিভিন্ন ইস্যুতে আগেও বহুবার আন্দোলন করেছে। তবে সম্প্রতি শাহবাগ আন্দোলনের নাস্তিক ব্লগার ইস্যুর উছিলা ধরে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে ১৩ দফা দাবী পেশ, ৬ এপ্রিল স্বৈরাচারী সরকারের বাধা উপেক্ষা করে বিশাল মহাসমাবেশ, ৫ মে ঢাকা অবরোধ ও পরবর্তী ঘটনাবলী তাদেরকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
যদিও তারা বলছে যে, তারা কোন রাজনৈতিক দল নয়, তাদের রাজনৈতিক কোন আকাংখা বা দাবী নেই, ইসলাম ও নবীর মর্যাদা রাই তাদের উদ্দেশ্য, কিন্তু তাদের দাবীগুলো এবং তাদের বক্তব্য-কথাবার্তা সবই তাদের ধর্মবাদী রাজনৈতিক চরিত্রকে পরিস্কার করে তুলে ধরে। তারা পরিস্কারই বলেছে, ক্ষমতায় থাকতে হলে বা যেতে হলে ১৩ দফা মানতে হবে। ১৩ দফায় তারা পরিস্কারভাবেই সাংবিধানিক, আইনগত ও সামাজিক বিধিবিধানগত কর্মসূচি তুলে ধরেছে, যা নির্দিষ্ট রাজনীতিকে প্রকাশ করছে। তারা পরিস্কারভাবেই একটি ইসলামী মৌলবাদী রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনেরই কিছু দিকের কথা বলছে।
* এ ধরনের একটি ধর্মবাদী রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচিকে কেন আমরা বিরোধিতা করি এবং কেনইবা সেটা একটি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রতিবন্ধক?
১৩-দফায় যে বিষয়গুলোকে টার্গেট করা হয়েছে সেগুলো হলো সংবিধান, ধর্ম প্রশ্নে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নারী প্রশ্ন, কাদিয়ানী প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক প্রশ্ন ইত্যাদি।
যদিও হেফাজতে ইসলাম আলোচনার কেন্দ্রে এখন এসে পড়েছে, কিন্তু তারা ছাড়াও যতসব ইসলামী দল বা সংগঠন দেশের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে দাবী দাওয়া নিয়ে মাঠে নামে তারা কম-বেশী একই ধরনের দাবী ও কর্মসূচিই তুলে ধরে।
এক কথায় এগুলো একটি ফ্যাসিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠারই কর্মসূচি মাত্র। যেখানে ভিন্নমত প্রকাশকে বর্বর রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা দমনের ব্যবস্থা করা হবে, নারীদেরকে অধস্তন প্রাণী হিসেবে সমাজে রাখা হবে, সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে সমাজকে মধ্যযুগীয় কুপমণ্ডুকতায় নিয়ে যাওয়া হবে।

এ বিষয়গুলোতে আমরা নিচে কিছুটা আলোচনা করছি।
১। ধর্মীয় মৌলবাদীরা সংবিধানে ইসলাম ধর্মীয় বিশ্বাসকে আনার জন্য বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম, আল্লাহর উপর বিশ্বাস ও আস্থাকে রাখা ও যুক্ত করার কথা বলে। এক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হলো, এদেশের ৯০% মানুষ মুসলমান, তাই এটাই করা উচিত।
বাস্তবে জনগণের ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করার অপপ্রয়াশে কোন ধর্মীয় সংগঠন নয়, বরং শাসক শ্রেণীর বুর্জোয়া তথাকথিত গণতান্ত্রিক দল ও নেতারাই সংবিধানে এগুলো যুক্ত করেছে। হাসিনা সরকার শুধু আরো শঠতার সাথে গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া ও প্রগতিমনা মধ্যবিত্তদেরকে হাতে রাখার জন্য সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্মের পাশাপাশি ধর্মনিরপেতা যুক্ত করে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস সংক্রান্ত বাক্যটিকে সরিয়ে দিয়েছে। আর এতেই মৌলবাদীরা আপত্তি করছে। যদিও শেখ হাসিনা ৩ মে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিস্কারভাবেই ব্যাখ্যা করেছে যে, নীতিগতভাবে মৌলবাদীদের এ দাবীর সাথে তাদের কোন বিরোধ নেই।
দেশের ৯০% জনগণ মুসলমান এ যুক্তিতে সংবিধানকেও মুসলমান বানাতে হবে, এটি সংখ্যাগুরুর নামে একটি ফ্যাসিবাদী যুক্তি ছাড়া আর কিছু নয়। এ যুক্তি মানার অর্থ হলো, যেসব দেশে খৃষ্টান বেশী সেখানে খৃষ্ট ধর্মের বিধানে রাষ্ট্র চলবে, হিন্দুর রাষ্ট্র হিন্দু নিয়মে চলবে ইত্যাদি যুক্তিও মেনে নেয়া। কিন্তু এটা গণতান্ত্রিক কোন নীতি হতে পারে না। সংখ্যাগুরু মানুষ ভোট দিয়ে যদি রাজতন্ত্র আনতে চায় তাহলে সেটা আনা যেমন গণতান্ত্রিক হবে না, এটাও তাই।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রথমত ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে। এটা জনগণের কে কতজন কী ধর্ম বিশ্বাস করে বা করে না তার উপর নির্ভর করে না। এমনকি এটা ভোটে নির্ধারণের কোন বিষয়ও নয়। পশ্চিমা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এখনো শপথের সময় বাইবেল ব্যবহার করা হয়, অথবা রাজা/রাণী রেখে দেয়া হয়েছে এসবের উদাহরণ আরো জঘন্য। ঐসব দেশে এগুলো ঘটছে বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের কারণে সামন্ততান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের কিছু কিছু লেজ এখনো রেখে দেবার ফলে। এই যুক্তি দেখিয়ে আমাদের দেশে সংবিধানে ধর্ম ঢুকানোটা পশ্চিমা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের নয়, বরং মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিকতার ওকালতী।
সংবিধানের এইরকম ধর্মীয় চেহারা দান এদেশের প্রতিক্রিয়াশীল শাসক বুর্জোয়া শ্রেণীই করেছে তাদের গণবিরোধী চরিত্রের কারণে। জিয়া, এরশাদের ধর্মীয় ভণ্ডামীগুলো হাসিনা আরো পোক্ত করেছে। বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম আর ধর্মনিপেক্ষতা সবগুলো একত্রে রেখে আইনী ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ভণ্ডামী করেছে বর্তমান সরকার। আর এসবেরই মদদ পেয়েছে ধর্মীয় মৌলবাদীরা।
হাসিনা ও তার চেলা-চামুণ্ডারা প্রায়ই ধর্মনিরপেক্ষতার এক উদ্ভট সংজ্ঞা দেয়। যখনই ধর্মীয় মৌলবাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং এই গণতান্ত্রিক বদমাইশদের কিছুটা রাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয় তখনই তারা তারস্বরে বলতে থাকে যে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, এর অর্থ হলো সকল ধর্মের প্রতি সমঅধিকার। ফলে আমরা এদের শাসনে দেখতে পাই যে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে দেশের প্রধান চারটি ধর্মের ধর্মগ্রন্থের পাঠ। মৌলবাদীদের সাথে পার্থক্যটা হচ্ছে, ওরা তথাকথিত ৯০% ভাগের ধর্ম রাষ্ট্রের কাজে রাখতে চায়, আর এরা সবগুলো ধর্মকেই রাখে। আসল মিল হলো এরা সবাই রাষ্ট্রের কাজে ধর্মটা রাখে। এটা কোন ক্রমেই প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক কোন নীতি নয়। এটা হলো এক বদমাইশী বুর্জোয়া ভন্ডামী।
গণতন্ত্রের একমাত্র নীতি হলো রাষ্ট্র থেকে ধর্মের বিচ্ছিন্নতা। তাহলেই রাষ্ট্র মধ্যযুগীয় অবিজ্ঞানের জগত থেকে আধুনিক প্রগতিশীল ইহজাগতিক জগতে প্রবেশ করতে পারে। রাষ্ট্র সর্বক্ষেত্রে আধুনিক জ্ঞান ও বিজ্ঞান দ্বারা চালিত হবে। এটাই হলো গণতান্ত্রিক সমাজের অগ্রগতির ভিত্তি।
এ ধরনের একটি রাষ্ট্রে ধর্ম ব্যক্তি-মানুষের জীবনে থাকবে অথবা থাকবে না, থাকলে সেটা ইসলাম বা অন্য কিছু হবে। পৃথিবীতে ধর্ম শুধু চারটি নয়, অসংখ্য রয়েছে। এমনকি ইসলামেও শত রকমের বিশ্বাস ও ব্যাখ্যা রয়েছে। যে কারণে শিয়া সুন্নি দাঙ্গা হয়, কাদিয়ানীদের খতম করা হয়, বহু ধর্ম-ব্যাখ্যাকারকে এলাকা ছাড়তে হয়। এসব বিশ্বাসের কোনটা নিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র চলতে পারে না। আধুনিক রাষ্ট্রে এসব বিশ্বাস পোষণ করা না করাটা মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও অধিকারের বিষয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সেটা অবশ্যই নিশ্চিত করবে, কিন্তু রাষ্ট্রের উপর যেকোন ধর্মের খবরদারী ও অনুপ্রবেশ কঠোরভাবে প্রতিহত ও উচ্ছেদ করবে। এদেশের বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী তার প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের কারণে কখনো তা করেনি। ফলে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ বুর্জোয়া অর্থেও গণতান্ত্রিক হয়ে উঠেনি।

২। অন্য সকল ইসলাম-ধর্মীয় মৌলবাদীদের মত হেফাজতও কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবী করেছে। নাস্তিকদের মেরে ফেলার বিধান দিচ্ছে। ইসলাম বা বিভিন্ন ধর্মের সমালোচনাকারীদের হত্যা করার স্বাধীনতা চাচ্ছে।
শাসক বুর্জোয়া শ্রেণীর গণতন্ত্রপন্থীরা একে মোকাবেলা করছে এই বলে যে, এগুলো প্রকৃত ইসলাম নয়। অর্থাৎ, তারা যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে সেটাই প্রকৃত ইসলাম। এভাবে কে আসল মুসলমান আর কোনটা প্রকৃত ইসলাম এই তর্কে মানুষকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। আর মুখ বন্ধ করা হচ্ছে ধর্ম প্রশ্নে সমালোচকদের। এটা ধর্মীয় মৌলবাদকে শক্তিশালী করা ছাড়া আর কিছু নয়।
কোনটা প্রকৃত ইসলাম আর কোনটা নয়, সে বিতর্ক ধর্মীয় আলেমরা করতে পারে, কিন্তু কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা রাজনীতি নয়। কাদিয়ানীরা প্রকৃত মুসলিম কিনা সেটা ধর্মীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিতর্কের কাজ। কিন্তু তারা যখন রাষ্ট্রকে তাদের অমুসলিম ঘোষণা করতে বলে তখন সেটা একটি কাদিয়ানী বিরোধী দাঙ্গা বাধানোর ভিত্তি সৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়। এটা এক চরম ফ্যাসিবাদী কর্মসূচি। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনই সেটা মানতে পারে না। অথচ হেফাজতীরা ১৩ দফা প্রকাশ করার পর আওয়ামী ঘরানার বুর্জোয়া রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও এনজিও-গুলো তাদেরকে কোরান পোড়ানোর যুক্তিতে যতনা বিরোধিতা করছে, তার এক কণা উন্মোচনও করছে না কাদিয়ানী প্রশ্নে এই মৌলবাদী কর্মসূচির ফ্যাসিস্ট চরিত্রকে।
ধর্ম প্রশ্নে যেকোন সমালোচনাকেই আল্লাহ-রসুলের অবমাননা বলা যেতে পারে। ধর্মীয় মৌলবাদীরা যদি কাদিয়ানীদেরকে অমুসলিম বলতে পারে, তাহলে একজন নাস্তিক বা অন্য ধর্মবিশ্বাসীরা কেন এদের ধর্মকে সমালোচনা করতে পারবে না?
অবশ্য ধর্মের সমালোচনা যখন দায়িত্বশীল বিজ্ঞানসম্মত সংগ্রামের বদলে ধর্ম ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে বুর্জোয়া কুৎসা-আক্রমণে পরিণত হয়, অথবা তা বিপ্লবী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগ্রামের সাথে সংযুক্ত না হয়ে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া রাজনীতিকে সেবা করে, তখন সেগুলো বরং ধর্মীয় প্রবক্তাদের উদ্দেশ্যকেই সেবা করে, ধর্মীয় উন্মাদণাকেই সেবা করে। তাই, প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ও প্রগতিবাদী সংগ্রামকে অবশ্যই এ বিষয়টিতে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে।
যেকোন আধুনিক মানুষের পক্ষেই এটা বোঝা সম্ভব যে, ধর্মবিশ্বাস দ্বারা বর্তমান বিশ্বে কোন রাষ্ট্রই চলতে পারে না। যদি চালাতে হয় তাহলে সেটা হয়ে পড়বে একটি ফ্যাসিবাদী সমাজ, যা কিনা ধর্ম প্রশ্নে শাসকদের ব্র্যান্ডের বাইরে অন্য কোন ভিন্নমতকে সহ্য করবে না। হেফাজতী ও ধর্মীয় মৌলবাদীরা যতই বলুন না যে, তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেবেন, কিন্তু সেটা এ রকম একটি ফ্যাসিবাদী সমাজ দিতে সম নয়। কৃষক যখন কোরবানী দেবার জন্য গরু পুষে তখন তাকে যথেষ্ট খাতির যত্ন করা হলেও সেটা সেই গরুর জন্য কোন নিরাপত্তা নয়। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরকে মুসলিমরা কেন নিরাপত্তা দেবে? যদি বলা হয় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা মুসলিমদেরকে নিরাপত্তা দেবে তাহলে কথাটি কেমন শোনাবে? এ ধরনের বক্তব্য উচ্চ ও অধস্তন সম্পর্ককেই প্রকাশ করে। রাষ্ট্র সকল নাগরিককে নিরাপত্তা দেবে সমানভাবে। এটাই গণতান্ত্রিক বিধান। নতুবা নয়।

৩। নারীদের বিষয়ে হেফাজতীরা শালীনতা, হেজাব, ইত্যাদি কথা নিয়ে এসেছে।
সবাই জানে যে, বুর্জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী ব্যবস্থাধীনে অন্য সব দেশের মত আমাদের দেশেও নারীকে ও তার দেহকে পণ্য করা হয়েছে। যৌনকে পণ্য করা হয়েছে। এরই ফলশ্রুতিতে দেশে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, নারীর অবমাননা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কিন্তু এটাই নারীর অবমাননার একমাত্র কারণ নয়। পুঁজিবাদের আগে মধ্যযুগে, ধর্মীয় কর্তৃত্বের যুগে নারীদের উপর নিপীড়ন ও অত্যাচার আদর্শগতভাবেই জারী ছিল। দাসী সম্ভোগ বৈধ ছিল, বহু-স্ত্রী প্রথার মাধ্যমে নারীকে অধস্তন করে রাখা হয়েছিল এবং তার উপর প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ছিল, নারীকে অনেক গোত্রে মানুষও মনে করা হতো না, অনাচারের কারণ হিসেবে নারীকেই দেখা হতো, পতিতালয়ের নরক বৈধ ছিল যা এখনো চলছে, নারীকে শক্তিমান শাসকদের উপঢৌকন হিসেবে দেয়া হতো, বিধবা বিবাহ হতো না, সতীদাহের মত বর্বর প্রথা চালু ছিল, নারীর সম্পদের অধিকার ছিল না বা সমঅধিকার ছিল না, শ্রমের মূল্য ছিল না, যুদ্ধেেত্র দখলকৃত শত্রুসম্পত্তির মধ্যে নারীকেও গণ্য করা হতো, স্ত্রীকে পেটানো বৈধ ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি বহু উদাহরণ দেয়া যাবে।
এগুলোর প্রায় সবই এখনো ব্যাপকভাবে সমাজে রয়েছে। নারী প্রশ্নে হেফাজতের দৃষ্টিভঙ্গি এই মধ্যযুগীয়তারই প্রভাব। এরা পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীলতার কিছু কিছুকে বিরোধিতা করতে চায় মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা। নারীকে যদি মানুষ হিসেবে রাষ্ট্র ও সমাজ সম-মর্যাদা দেয় তাহলে নারী পুরুষ উভয়েই নারীর নিরাপত্তা ও শালীনতা রক্ষা করবে। হেফাজতীরা একদিকে হিজাবে উদ্বুদ্ধকরণের কথা বলেছে, অন্যদিকে ইসলামে হিজাব বাধ্যতামূলক সেটাও বলেছে। তারা পুরুষকে ঢেকে রাখার কথা বলছে না কেন? পুরুষ কি আকর্ষণীয় নয়, নারীর কাছে? তাদের মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীকে দেখাই হচ্ছে পাপের উৎস হিসেবে। তাদের বর্ণিত শালীনতার সংজ্ঞা কী? তারা পোষাককে বানাতে চায় অন্তর্বাস, বিপরীতে পুঁজিবাদ অন্তর্বাসকে বানিয়েছে পোশাক। কোনটাই স্বাভাবিক নয়। পুরুষ ও নারীর নিজ নিজ শারীরিক বৈশিষ্ট রয়েছে। সে অনুযায়ী সুস্থ সংস্কৃতিবান ও প্রগতিশীল মানুষ পোশাক পরবে। যা আবার সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল। কাজের বৈশিষ্ট অনুযায়ী বিচিত্র। এইসব ধর্মীয় মৌলবাদীরা কীভাবে আশা করেন যে, হিজাব পরে গ্রামের কৃষক নারী, বা শহরের নির্মাণ শ্রমিক নারীরা তাদের পেশাগত কাজ করবেন; ফুটবল খেলবেন, দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন বা সাঁতার কাটবেন?
তারা সুস্পষ্টভাবে সম্পদে নারী-পুরুষের সমঅধিকারকে বিরোধিতা করছে। একেক ধর্মে পৈত্রিক সম্পত্তি বন্টনের একেক বিধান রয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাষ্ট্র এ সম্পদে নারী-পুরুষের সমঅধিকার না দিলে সেটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে পারে না। আওয়ামী প্রতিক্রিয়াশীল নারী নীতি ও শিক্ষা নীতিকে তারা বিরোধিতা করছে পশ্চাদপদ জায়গা থেকে। আমরা তার বিরোধিতা করি বিপরীত জায়গা থেকে। ধর্মীয় মৌলবাদীদের আপত্তির মুখে বহু আগেই আওয়ামী সরকার ঘোষণা করেছিল যে, ইসলামের বিরোধী হলে কোন নীতিই কার্যকর হবে না। এভাবে হাসিনা সরকার জঘন্যভাবে মৌলবাদের কাছে নতিস্বীকার করেছে।

৪। প্রাণীর ভাস্কর্য করা যাবে না, কারণ ইসলামে বারণ রয়েছে। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, গাছেরও প্রাণ আছে। সেখানে মৌলবাদীরা কী করবে? নবী মোহম্মদের ছবি আঁকা যাবে না, কারণ ধর্মে বারণ রয়েছে। কিন্তু আজ হজ্জ করতেও ছবি লাগে। মানুষের ছবি তোলা ও ছাপানো, টেলিভিশনের ছবি এসবকে মৌলবাদীরা মেনে নিচ্ছে কোন ধর্মীয় বিধান মতে? এমনকি তারাও ধর্মীয় বিধানকে যুগের সাথে সাথে কিছুটা বদলে নিতে বাধ্য হচ্ছে না কি?

* প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আধুনিক বিজ্ঞান ও মূল্যবোধ দ্বারা চলতে বাধ্য। আমাদের শাসক বুর্জোয়া শ্রেণী ও তাদের রাষ্ট্র প্রতি পদে পদে দুই নৌকায় পা দিয়ে চলেছে। এর কারণ হলো যেমন হেফাজতী কর্মসূচিতে, তেমনি আওয়ামী-বিএনপিসহ সকল বুর্জোয়া পার্টির কর্মসূচিতে দেশের ৯০% যে জনগণ সেই শ্রমিক, কৃষক, দরিদ্র ও সাধারণ মধ্যবিত্ত জনগণের জীবনের অসংখ্য সমস্যার কোন উল্লেখই নেই। তার কোন আলোচনা তারা কেউই করে না। এ ব্যবস্থার আমূল রূপান্তরের প্রশ্ন-তো একেবারেই অবান্তর। বাস্তবে ৯০% জনগণের সেই প্রকৃত কর্মসূচিকে ধামাচাপা দেবার জন্যই এইসব বুর্জোয়া-সামন্ততান্ত্রিক কর্মসূচি তোলা হয়, তার উপর কাইজ্যা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা হয় এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করে বিভক্ত করে সেসবের পিছনেই লেলিয়ে দেয়া হয়। এগুলো হলো বিদ্যমান প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখবারই বিভিন্ন কর্মসূচি। এসব গণবিরোধী রাজনীতিরই পরিণতি হলো মৌলবাদী উত্থান।

* হাসিনা সরকার নিজেকে বেশী মুসলমান ও প্রকৃত মুসলমান দেখাতে চায়। আর পদে পদে মৌলবাদীদের সাথে আপোষ করে। কারণ, তাদের নিজেদের চরিত্র প্রগতিশীলও নয়, গণতান্ত্রিকও নয়। আজ মৌলবাদের হুজুগে নিজেদের রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হওয়ায় তারা মৌলবাদ বিরোধিতার কথা বলছে। মৌলবাদীদেরকে ধর্ম-ব্যবসায়ী বলছে। কিন্তু ধর্ম-ব্যবসায়ী তো সে, যে কিনা প্রতারণার সাথে ধর্মকে ব্যবহার করে। সেটা-যে এদেশের গণশত্রু বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী সেটা বিগত ৪২ বছরেই পরিস্কার হয়ে গেছে। যাদের প্রধান প্রতিনিধিত্ব এখন হাসিনা-আওয়ামী লীগ করছে। ৫ মে’র ঘটনার পর সরকারী ও আওয়ামী দলগুলোই শুধু নয়, ভন্ড বাম ও এনজিও নারী সংগঠনগুলোও হেফাজতীদের (এবং তার সূত্র ধরে জামাত ও বিএনপি’র) বিরুদ্ধে যে প্রচার অভিযান চালাচ্ছে তার কেন্দ্র বিন্দু হলো কোরান পোড়ানোর বিষয়। কে কত বেশি কোরান ও ইসলামের সেবক ও অনুসারী তারই যেন প্রতিযোগিতা চলছে। রাজনৈতিক ও আদর্শগতভাবে মৌলবাদকে সংগ্রাম না করে এই ধর্ম-ব্যবসা ও প্রতারণা মৌলবাদকে পুনরায় শক্তিই যোগাচ্ছে মাত্র।
তারা অনেকে মৌলবাদীদেরকে সংগ্রামের ক্ষেত্রে ’৭১-এর চেতনার কথা বলে থাকে। বিশেষত ভণ্ড বাম ও নারী এনজিও-গুলো। এর মাধ্যমে বাস্তবে তারা ’৭১-এর আওয়ামী প্রতিক্রিয়াশীল চেতনার সাফাই গায়। সেই চেতনায় যদি মৌলবাদীদের প্রকৃত কোন সংগ্রামই করা যেতো তাহলে তাদের সৃষ্ট ও বিগত ৪২ বছর ধরে তাদের দ্বারা চালিত এ বাংলাদেশে মৌলবাদীরা এতটা শক্তি নিয়ে কখনই আসতে পারতো না।
এই শাসক পার্টিগুলো, বুর্জোয়া শ্রেণী ও তাদের রাষ্ট্র দেশজুড়ে ৯০ হাজার মাদ্রাসা বানিয়ে রেখেছে, পীরবাদীদের রমরমা চলছে যা প্রতিটি বুর্জোয়া পার্টি মদদ দিয়েছে, ২ লক্ষ মসজিদকে সরকারী সাহায্যে চালানো হচ্ছে। এভাবে রাষ্ট্র থেকে শাসক বুর্জোয়া শ্রেণী ধর্মীয় মৌলবাদ উদ্ভবের এক অতি শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছে, যা যেকোন বুর্জোয়া দল ও প্রতিষ্ঠান থেকে শক্তিশালী আদর্শগতভাবে, সাংগঠনিকভাবে ও আয়তনে। এরই একটা অংশের প্রকাশ ঘটছে হেফাজতের আন্দোলনে। এটা এই ব্যবস্থারই অংশ, হঠাৎ করে এই মৌলবাদ সৃষ্টি হয়নি। এর জন্য শাসক বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিটি বুর্জোয়া পার্টি ও এই রাষ্ট্র দায়ী।
* ধর্মীয় মৌলবাদীদের এই উত্থানের সাথে বিশ্ব পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। নিকট অতীতে বিশ্বব্যাপী মুসলিম মৌলবাদী উত্থান ঘটেছিল মার্কিনের মদদ, প্রশ্রয় ও আশ্রয়ে যখন তারা প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যবাদ সোভিয়েতকে মোকাবিলার জন্য আফগানিস্তান-পাকিস্তানে তাদের সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীকালে আফগানিস্তান, ইরাক, এখন লিবিয়া, সিরিয়ায় আগ্রাসনের ফলে সেসব দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বিরোধিতা আশ্রয় নেয় ইসলাম ধর্মীয় মৌলবাদে। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রকৃত ও একমাত্র প্রগতিশীল শক্তি কমিউনিজমের চলমান সংকটের কারণে এর উদ্ভব অনিবার্য হয়ে উঠেছে। মৌলবাদী উত্থানকে পরাজিত করার একমাত্র উপায় হলো বিশ্বব্যাপী কমিউনিজমের আদর্শকে পুনর্জাগরিত করা, যা কিনা প্রগতিশীল ভিত্তিতে সাম্রাজ্যবাদ ও আমাদের দেশগুলোতে দালাল প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াদের বিরোধিতা ও উচ্ছেদ করতে পারে। প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক/কমিউনিস্ট আন্দোলন ব্যতীত ধর্মীয় মৌলবাদ প্রতিহত করার আর কোন পথ নেই।

উদ্ধৃতি
“ধর্ম নিয়ে রাষ্ট্রের কোন গরজ থাকা চলবে না এবং ধর্মীয় সংস্থাসমূহের রাষ্ট্রীয় মতার সঙ্গে জড়িত হওয়া চলবে না। যেকোন ধর্মে বিশ্বাস অথবা কোন ধর্মই না মানায় (অর্থাৎ নাস্তিক হওয়া যেমন প্রতিটি সমাজতন্ত্রী) সকলেই থাকবে সম্পূর্ণ স্বাধীন। ধর্মবিশ্বাসের জন্য নাগরিকদের অধিকারে কোন প্রকার বৈষম্য কোনক্রমেই সহ্য করা হবে না। এমনকি সরকারী নথিপত্রে যেকোন নাগরিকের ধর্মের উল্লেখমাত্রও প্রশ্নাতীতভাবে বর্জিত হবে। রাষ্ট্রানুমোদিত গির্জাকে কোন অর্থমঞ্জুরী অথবা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক সংস্থাকে কোন প্রকার সরকারী বৃত্তিদান করা চলবে না। এগুলোকে হতে হবে সমমনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ স্বাধীন, সরকারী সংশ্রব-বর্জিত প্রতিষ্ঠান।”

“ধর্মীয় প্রশ্নকে বিমূর্ত, আদর্শবাদী কায়দায়, শ্রেণীসংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কহীন ‘বুদ্ধিবাদী’ প্রসঙ্গ রূপে উপস্থাপিত করার বিভ্রান্তিতে আমরা কোন অবস্থাতেই পা দেব না, বুর্জোয়াদের র‌্যাডিকেল ডেমোক্রেটগণ প্রায়ই যা উপস্থাপিত করে থাকে।………পুঁজিতন্ত্রের তামস শক্তির বিরুদ্ধে স্বীয় সংগ্রামের মাধ্যমে চেতনালাভ ব্যতীত যেকোন সংখ্যক কেতাব, কোন প্রচারে প্রলেতারিয়েতকে আলোকপ্রাপ্ত করা সম্ভব নয়। ………..আমরা সব সময়ই বৈজ্ঞানিক বিশ্ববীক্ষা প্রচার করব, নানাবিধ ‘খৃষ্টানের’ অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম আমাদের প্রয়োজন। এর অর্থ মোটেই এই নয় যে, ধর্মের প্রশ্নকে আমাদের সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া উচিত, যা তার প্রাপ্য নয়।” লেনিন, ‘সমাজতন্ত্র ও ধর্ম’, ডিসেম্বর, ১৯০৫।

Posted in Uncategorized | Leave a comment

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক ও তাদের মুক্তি প্রসঙ্গে

বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়া আদিবাসী হিসেবে পরিচিত অন্যান্য জাতিসত্ত্বা রয়েছে তা দেশের শাসক শ্রেণী স্বীকৃতি দেয় না। পররাষ্ট্রমন্ত্রি দীপুমনিসহ সরকারের মন্ত্রিরা বলছে বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই। যেমন একজন জীবন্ত মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে বলছে ক্রশফায়ারে মৃত্যু হয়েছে। এমনি মিথ্যা সংস্কৃতির উপর দাঁড়িয়ে আছে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের দালাল বড় ধনী শ্রেণী ও তার লুটেরা শাসন ব্যবস্থা। ‘৭২-এর সংবিধানেই তৎকালীন মুজিব সরকার আদিবাসীদের কোন ধরনের অধিকার স্বীকার করেনি। সেই সংবিধানের ৩নং ধারায় বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।” এই বক্তব্যকে তখনই বিরোধিতা করেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ন লার্মা। আর শেখ মুজিব চাকমা নেতা লার্মাকে বাঙালি হয়ে যেতে বলেছিল। সে কারণেই সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার জনগণ পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিল।
‘৯৭ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার এক প্রতারণাপূর্ন শান্তিচুক্তি করে সেই সংগ্রামের অবসান করে। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমতলের আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র জাতি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি, তাদের জমি, জলাধার এবং বনএলাকার অধিকার সংণের বিশেষ ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু মহাজোট সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আদিবাসী তথা সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বাগুলোকে জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তাদেরকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি বিশ্ব আদিবাসী দিবসের কোন অনুষ্ঠানে সরকারী কর্মকর্তাদের অংশ না নেওয়া এবং কোন সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতা না করার নির্দেশ দিয়েছে। বলা হয়েছে, এ দেশে কোন আদিবাসী নেই। এভাবে সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার অধিকারকে অস্বীকার করেছে। তাদের নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারের সাথেই তারা বেঈমানী করেছে।
পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল নিয়ে বিএনপি‘র নেতৃত্বে ১৮ দলীয় জোট আন্দোলন করলেও আদিবাসী তথা সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে কোন কথা নেই। বাঙালি বড় ধনী শ্রেণীর প্রতিনিধি আওয়ামী-বিএনপি জোটের সাথে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির কোন পার্থক্য নেই। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী যেমনি বাঙালিসহ অন্যান্য জাতির অধিকার স্বীকার করতো না এবং উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সকল জাতির উপর চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল, তেমনি বাঙালি বুর্জোয়া শাসকরাও বাংলাদেশের অন্যান্য জাতিসত্ত্বার অধিকার ও বিকাশকে অস্বীকার করছে।
বাংলাদেশের শাসক বড় ধনী শ্রেণী কেন এ দেশে আদিবাসী নেই বলছে এবং কেন সংবিধানে এর স্বীকৃতি দিচ্ছে না? কেন উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠি তারা বলছে? এর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থটা কি?
এর কারণ হলো এই স্বীকৃতি দিলে তাদেরকে ভূমির অধিকার এবং জাতি হিসেবে আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকার ও বিকাশের অধিকার দিতে হয়। বুর্জোয় বড় ধনীদের স্বার্থেই আওয়ামী লীগ সরকার সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার জনগণকে সংবিধানে জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করছে। সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্যই এ দেশে আদিবাসী নেই প্রমাণ করার অপচেষ্টা করছে।
আজকে সরকার কুযুক্তি করছে এই ভূখন্ডে আদিকাল থেকে বাঙালিরা বসবাস করে আসছে, তাই বাঙালিরাই হচ্ছে এখানকার আদিবাসী। ইতিহাসগতভাবেও এ তথ্য সঠিক নয়। আদিতে এ ভূখন্ডে মুন্ডা জাতি বাস করতো। গবেষণায় দেখা যায়, এখানে ১৭ হাজার বছর ধরে মানুষ বাস করলেও বাঙালিরা বাস করছে মাত্র ১ হাজার বছর ধরে। আর বাংলা বর্ণমালার বয়স মাত্র ৫০০ বছর। সে অর্থে সংখ্যালঘু জাতি সত্ত্বার জনগণই আদিবাসী।
সমতলের আদিবাসীরা বাঙালিদের মধ্যে অনেক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করেন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসীরা কেন্দ্রীভূতভাবে বসবাস করেন। এখানকার পরিস্থিতি আরো ভিন্ন। এখানকার ভূখণ্ড আর বাঙালি অধ্যুষিত সমতলের ভূখণ্ড ঐতিহাসিকভাবে এক ভূখণ্ড নয়। মাত্র ৫০ বছর আগেও এ অঞ্চলে বাঙালিরা ছিল না বললেই চলে। ভারতবর্ষ বিভক্তির সময় ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের বসবাস ছিলো মাত্র ১.৫ শতাংশ। যারা মূলতঃ চাকুরী ও ব্যবসায়িক উদ্দেশে সাময়িকভাবে সেখানে বসবাস করতো। বর্তমানে সেখানে বাঙালির সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি। বাঙালি বড় ধনী শ্রেণী সমতলের ভূমিহীন-গরীব কৃষকদের পাহাড়ে পুনর্বাসন করে পাহাড়ীদেরকে ইতিমধ্যেই সংখ্যালঘুতে পরিণত করে ফেলেছে।
আদিবাসী শব্দটার সংজ্ঞা নিয়েও রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণী জঘন্য প্রতারণা করছে। আদিকাল থেকে বাস করে যারা তারাই আদিবাসী এমন ধারণা-ব্যাখা পৃথিবীর কোথাও নেই যদিও এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক বটে। এমনকি সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদীদের প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘও এ সংজ্ঞা বলে না। ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ এ বিষয়ে যে সংজ্ঞা গ্রহণ করেছে তাহলোÑ “আদিবাসী সম্প্রদায়, জনগোষ্ঠী ও জাতি বলতে তাদের বোঝায়, যাদের ভূখন্ডে প্রাক আগ্রাসন এবং প্রাক উপনিবেশ থেকে বিকশিত সামাজিক ধারাসহ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, যারা ঐ ভূখন্ডে বা ভূখন্ডের কিয়দংশ বিদ্যমান অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র মনে করে। বর্তমানে তারা সমাজে প্রান্তিক জনগোষ্ঠিভুক্ত। এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আইন ব্যবস্থার ভিত্তিতে জাতি হিসেবে তাদের ধারাবাহিক বিদ্যমানতার আলোকে তারা তাদের পূর্ব পুরুষদের ভূখন্ড ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ভবিষ্যত বংশধরদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।” এই সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশের সকল অঞ্চলে সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বাসমূহের জনগণ আদিবাসী হিসেবে পরিচিত।
আদিবাসী জনগণের উপর জাতিগত নিপীড়ন বিরোধী পাহাড়ে ও সমতলে বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন গড়ে উঠেছে। এসব সংগঠন শাসক শ্রেণীর কাছে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, আদিবাসীদের মানব অধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন এ জাতীয় কিছু সংস্কারমূলক দাবী-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করছে। এরা শাসক শ্রেণীর পাতা ফাঁদে ফেলছে এই জনগণকে। অর্থাৎ আদিবাসী কি আদিবাসী না এই বিতর্ক সামনে এনে প্রচলিত সংবিধানে স্বীকৃতির দাবী তুলে মূলতঃ জাতি হিসেবে স্বীকৃতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে ধামাচাপা দিচ্ছে। সন্তু লারমা এক সেমিনারে বর্তমান রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের মনোভাব পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছেন। এখানেই শ্রেণী মূল্যায়ন ও শ্রেণী সংগ্রাম অনুপস্থিত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে জেএসএস এবং ইউপিডিএফ-এর মধ্যে মৌলিক লাইনগত ও কর্মসূচীগত কোন পার্থক্য নেই। তারা জাতিগত সংগ্রামের সাথে সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবকে যুক্ত করে না। সঠিক রাজনৈতিক দিশার অভাবে এবং শাসব শ্রেণীর মদদে পাহাড়ি সংখ্যালঘু জাতিগুলোর মাঝে অসংখ্য গ্র“পের সৃষ্টি হয়েছে। ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত চলছে। যার ফায়দা লুটছে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী।
আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবী অবশ্যই ন্যায্য। কিন্তু সাংবিধানিক স্বীকৃতিই যথেষ্ঠ নয়; সমস্যার প্রকৃত সমাধানও নয়। কারণ, এই সংবিধানটাই গণতান্ত্রিক নয়। বাংলাদেশ বাঙালির রাষ্ট্র বলা হলেও সব বাঙালি, ৯০% ‘বাঙালি’ এই রাষ্ট্রের মালিক নয়। বাঙালি শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ ব্যাপক জনগণ শোষিত-নিপীড়িত। এই রাষ্ট্রের মালিক বড় বড় ধনী ‘বাঙালি’রা এবং তাদের বৈদেশিক প্রভু সাম্রাজ্যবাদীরা।
তাই বাঙালি শ্রমিক-কৃষক-আদিবাসী নির্বিশেষে নিপীড়িত জনগণকে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ ও তাদের দেশীয় দালাল বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর শোষণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিবর্তনের বিপ্লবী কর্মসূচীর ভিত্তিতে সংগঠিত হতে হবে। এর সাথে জাতিগত প্রশ্নে নির্দিষ্টভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সায়েত্ত্বশাসন, অন্যান্য আদিবাসী অধ্যুষ্যিত এলাকায় বিশেষ আঞ্চলিক প্রশাসন গড়ে তোলা, খোদ কৃষকের হাতে জমি এই নীতির ভিত্তিতে সকল আদিবাসীকে জমিতে অধিকার প্রতিষ্ঠা (দলিল থাক বা না থাক), খনিজ ও বনজ সম্পদ প্রথমে আদিবাসীদের উন্নয়নে ব্যবহার প্রভৃতি কর্মসূচি আনতে হবে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদে সজ্জিত শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বেই কেবলমাত্র এ জাতীয় বিপ্লবী ধারার সংগঠন গড়ে উঠতে পারে। সমাজতন্ত্রের লক্ষে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে হবে। এ পথেই আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারসহ সার্বিক মুক্তি সাধিত হতে পারে।

Posted in Uncategorized | Leave a comment

বুর্জোয়া দলগুলোর মতা ভাগাভাগির কোন্দলের রাজনীতিতে শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত জনগণের নাভিশ্বাস

জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলেই বুর্জোয়া দলগুলোর কোন্দল চরমে পৌঁছে। সচেতন জনগণ বুঝেন এই দ্বন্দ্ব সংঘাত খুনোখুনির অন্তর্নিহিত কারণ। ক্ষমতার বড় ভাগটা দখলে রাখা বা দখলের নেয়ার অপপ্রয়াস হিসেবেই এই কুত্তা-কামড়াকামড়ি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জনগণ বুর্জোয়া দলগুলোর এই অপসংস্কৃতি তথা ‘গনতন্ত্রে’র সাথে পরিচিত। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
বুর্জোয়া শাসক ও তাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম শোষণ-লুটপাট, দমন-নির্যাতনে জনগণের প্রাণ এমনিতেই ওষ্ঠাগত। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বুর্জোয়া দলগুলো কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন করবে তা নিয়ে কোন্দল, সংঘাত এবং হানাহানি। আওয়ামী সরকার মতার বড় ভাগটা দখলে রাখার জন্য ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে (আইন-আদালত সংসদ ও বাহিনীর দ্বারা)। তারা ২০০৭ সালের ১/১১ অজুহাত দেখিয়ে সংসদ ও আদালতের মাধ্যমে সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেছে। যা বুর্জোয়া দলগুলোর হানাহানির কারণেই বুর্জোয়া শ্রেণী গ্রহণ করেছিল। আওয়ামী সরকার তাদের অধীনে নির্বাচন করতে বিএনপি জোটকে বাধ্য করতে চাচ্ছে। কিন্তু বিএনপি তাতে নারাজ। এই বুর্জোয়া দলগুলো নিজ নিজ গোষ্ঠীগত স্বার্থে অটল। কেউই মতার বড় ভাগটা ছাড়তে চাচ্ছে না। দেশ-জনগণের স্বার্থ গোল্লায় যাক তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। আওয়ামী সরকারের চার বছরে অসংখ্য গণবিরোধী কাজ তারা করেছে। কিন্তু বিএনপি এর বিরুদ্ধে শক্ত কোন প্রতিবাদ আন্দোলন করেনি। আজ তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে জান-প্রাণ দিয়ে লাগাতার হরতাল করছে; আর আওয়ামী সরকার রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ চালিয়ে তা দমন করছে।
বুর্জোয়া দলগুলো এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচন এলেই তারা জনগণকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যা প্রকৃতপক্ষে তারা করতে সক্ষম নয়। কেন নয়, তা আমরা আমাদের আগের সংখ্যায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছি। সংক্ষেপে- ‘৭১-এর পর আওয়ামী লীগ ও তার নেতা শেখ মুজিব পাকিস্তানী মূল যুদ্ধাপরাধীদের এবং তাদের দোসর এই দেশের রাজাকার আলবদরদের ব্যাপক অংশের রাজনৈতিক অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছিল। জামাত-শিবিরসহ বাকীদেরকে পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বুর্জোয়া দলগুলো বিগত ৪২ বছর ধরে সমাজে ও রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। আজকে জনগণের ন্যায্য দাবীকে ইস্যু করে আওয়ামী সরকার প্রহসনের বিচার করছে মাত্র। যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে মূলতঃ তাদের নির্বাচনী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-জামাতকে কোনঠাসা করছে। জনমতকে নিজেদের নির্বাচনী স্বার্থে ব্যবহার করে বিএনপি-জামাতের আন্দোলনকে হত্যা, গ্রেপ্তার, মামলা, হামলা করে তথা রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ চালিয়ে দমন করছে।
আওয়ামী সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোনঠাসা করার পাশাপাশি তাদের মাঝে ভাঙ্গন সৃষ্টির অপচেষ্টায় জামাতের সাথে গোপন আঁতাত করে তাদের নেতা কাদের মোল্লার অপরাধের লঘু শাস্তি দিলে সৃষ্টি হয় শাহবাগ আন্দোলন। শাহবাগ আন্দোলন উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত তরুণদের ন্যায্য আবেগ নিয়ে শুরু হলেও তাদের গুরুতর রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণে আওয়ামী সরকার এই আন্দোলনের কাঁধে সওয়ার হয়ে এটিকে একটি প্রহসনের আন্দোলনে পরিণত করতে সম হয়। কিন্তু জামাতের সাথে আপোষ-আঁতাত বিঘ্নিত হয় আপাততঃ। আর জামাত-শিবির সাম্রাজ্যবাদ ও শাসক শ্রেণীর মদদে-আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে বিগত দিনে বিকশিত ও শক্তিশালী হয়ে আজ তারা ‘৭১-এর খুনী রাজাকার নেতাদের বাঁচানোর জন্য দোর্দন্ড প্রতাপে প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলনে মাঠে নেমেছে। বিএনপি তাদের মদদ দিচ্ছে। আর আওয়ামী সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে পাখির মত গুলি করে আন্দোলনকারীদের ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে। খুন-জখম, মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্রেরণ করছে। শাহবাগ আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধী বিচার এবং আগামী নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টিসহ বুর্জোয়া পার্টিগুলো এবং রাষ্ট্রযন্ত্র দেশে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে চলছে।
এ ছাড়াও শাসক শ্রেণীর সকল গোষ্ঠী বিবিধ ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে লিপ্ত। একদিকে সংখ্যালঘু হিন্দু জনগণের উপর আক্রমণ করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা, অন্যদিকে শাহবাগ আন্দোলনে যুক্ত কতিপয় ব্লগারের দ্বারা জনগণের ধমীয় অনুভূতিতে আঘাতকে কেন্দ্র করে দেশের মুসলিম জনতাকে ধর্মীয় মৌলবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভোট রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করার অপপ্রয়াসে আওয়ামী লীগ ধর্মীয় মৌলবাদীদের সাথে নির্লজ্জ আপোষ করে। তাদের দাবীমত শাহবাগ আন্দোলনে যুক্ত ব্লগারের কয়কজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে হাজতে পাঠায়। এভাবে তারা ধর্ম প্রশ্নে যে কোন মত পোষণ ও প্রকাশ করার গণতান্ত্রিক অধিকারকে পদদলিত করে। অন্যদিকে কিছু ব্লগারের ধর্ম প্রশ্নে বক্তব্য/মতকে পুঁজি করে বিএনপি-জামাত, এমনকি মহাজোট সরকারের শরীকদল জাতীয় পার্টি জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিকে ভোট রাজনীতিতে ব্যবহার করার হীন স্বার্থে ধর্মীয় মৌলবাদকে উস্কে দেয়।
ভোট রাজনীতি নিয়ে বুর্জোয়া দলগুলোর কামড়াকামড়ি হানাহানির সুযোগে এবং তাদের মদদে ধর্মীয় মৌলবাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা ধর্ম হেফাজতের নামে দেশে কার্যত প্রতিক্রিয়াশীল ব্লাসফেমী আইন করার দাবী তুলছে। ধর্ম হেফাজতের নামে মূলতঃ ১৩ দফা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দাবী তুলে ধরছে। যা দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, নারী অধিকার ও ধর্ম প্রশ্নে মধ্যযুগীয় বর্বর আইনের দাবি। দেশকে আফগানিস্তানের মত তালেবানী রাষ্ট্র বানানোর অপচেষ্টা।
হেফাজতে ইসলাম তাদের ১৩ দফা দাবী আদায়ে ৫ মে ঢাকা অবরোধ করে। হাসিনা সরকার একে পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি দ্বারা নির্মমভাবে দমন করেছে। অবরোধকারীরা ঢাকার শাপলা চত্বরে সমাবেশিত হওয়ার সময় পুলিশ-র‌্যাব ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের আক্রমণের সূত্র ধরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। লক্ষ লক্ষ মানুষ শাপলা চত্তরে অবস্থান নেয় এবং সরকার বিরোধী ভূমিকায় চলে যায়। বিএনপি-জামাত ও জাতীয় পার্টি পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হেফাজতের উপর ভর করে সরকার পতনের, অথবা অন্তত ভোট রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলার ষড়যন্ত্র করেছিল। সরকার আতংকিত হয়ে ফ্যাসিস্ট কায়দায় রাতের অন্ধকারে তার যৌথ বাহিনী দিয়ে হাজার হাজার রাউন্ড গুলি, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, জলকামানসহ সমস্ত ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে অজানা সংখ্যক মানুষ হত্যা ও অগণিত আহত করার মধ্য দিয়ে হেফাজতকে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসে।
আওয়ামী সরকার এখন শাহবাগ ও ধর্মীয় মৌলবাদ উভয়কে বাগে রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে বলছে বাংলাদেশে ব্লাসফ্যামী আইন করা হবে না। অন্যদিকে বলছে দেশ চলবে নবীজির দেখানো পথে। এই সব কথাই বিভ্রান্তিকর ও প্রতারণামূলক।
বুর্জোয়া দলগুলোর নির্বাচনী রাজনীতির হানাহানিতে জনগণ অতিষ্ঠতো বটেই, বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী প্রতিষ্ঠান এমনকি বুর্জোয়া ব্যবসায়ীরাও হতাশ হয়ে পড়ছে। তারা বড় দুই দলের সমঝোতার দুতিয়ালী করছে। কিন্তু কাজ খুব একটা হচ্ছে না। এটা শাসক শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের অতি-তীব্রতাকেই প্রকাশ করে। বড় দুই দলই যা বলছে তার অর্থ হলো ভাগ যেভাবেই হোক, তাল গাছটা আমার।
এ অবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত-হস্তপে-খবরদারী একেবারে নগ্নভাবে চলছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনাসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা ঘন ঘন বৈঠক করছে। আর নিজেদের সুবিধা আদায়ের সুযোগের সন্ধান করছে। অবশেষে সাম্রাজ্যবাদের বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব, বানকি মুনের বিশেষ দুত অস্কার ফারনানদেজ তারানকো দুই দলকে সংলাপে বসার নির্দেশ দিয়ে গেল। তারাও মাথা ঝুলালো, বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা ক্ষীণ আশার আলো দেখলো। কিন্তু যে লাউ সেই কদু। সরকার এবার এক মাসের জন্য সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করলো নিজেদের ও পরে দলগুলোর সভা-সমাবেশের সুযোগ রেখে। বুর্জোয়া দলগুলোর এই হানাহানির সুযোগ নিতে পারে সাম্রাজ্যবাদের দালাল তৃতীয় শক্তি, যার আশংকা এখন সর্বস্তরে আলোচিত হচ্ছে।
সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ এবং বুর্জোয়া দলগুলোর এই সব অপকর্মের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক ও দরিদ্র জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। আর বুঝতে হবে নির্বাচিত সরকার বা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার যার অধীনেই নির্বাচন হোক না কেন, শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ জনগণের কোন স্বার্থ এতে নেই। বুর্জোয়া নির্বাচনে যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন তারা আওয়ামী মহাজোট সরকারের মতই শোষণ-লুটপাট চালাবে। তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়াবে। খনিজ সম্পদ বিদেশে পাচার করবে। সার ও কৃষি উপকরণের মূল্য বাড়াবে। কিন্তু কৃষক কৃষি পন্যের ন্যায্য মূল্য পাবে না। চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী বন্ধ হবে না। সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের উচ্ছেদ হবে না।
তাই, শ্রমিক-কৃষক ও দরিদ্র এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত জনগণের করণীয় হচ্ছে এই বুর্জোয়া ভোটবাজী রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করা। নিজ নিজ শ্রেণী পেশার কর্মসূচীর ভিত্তিতে ঐক্য ও আন্দোলন গড়ে তোলা। সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী ও তাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা উচ্ছেদ, সমাজতন্ত্রমুখীন নয়াগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়া। এ পথেই নিপীড়িত জনগণের মুক্তি আসবে।

Posted in Uncategorized | Leave a comment

গার্মেন্টস শিল্প

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে শিল্প হিসেবে সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর গার্মেন্ট শিল্পের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিগত প্রায় তিন দশক ধরে গড়ে ওঠা রফতানি আয়ের ৮০ ভাগই আসে এ খাত হতে। এ সেক্টরে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। যার ৮০ ভাগ অর্থাৎ ৩০-৩২ লাখই নারী শ্রমিক। এ শিল্পের এত দ্রুত বিকশিত হওয়ার অন্যতম কারণ এ দেশীয় সস্তা শ্রম বাজার। এ দেশের অর্থনীতির বিগত কয়েক দশক ধরে কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশের ফলে গ্রামীণ জনজীবনে এক ভয়াবহ সংকটের তৈরি হয়। এনজিও ও মহাজনী সুদে জর্জরিত, ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত, জমিহারা নিঃস্ব-প্রায় কৃষক উদ্ধাস্তুর মতই ঠাঁই নেয় শহরের ঘিঞ্চিতে। জীবন বাঁচাতে এদের অধিকাংশই আশ্রয় নেয় গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্প ক্ষেত্রে ও নানা শ্রমশোষণমূলক পেশায়। সহজলভ্য ও কোন কারিগরী দতা ছাড়াই গ্রাম থেকে আগত নারীদের এক বড় অংশ অত্যন্ত স্বল্প মজুরীতে (ন্যূনতম ২৫০০ টাকায়) গার্মেন্ট শ্রমিক হিসেবে যোগ দেয়। যাদের অধিকাংশের বয়স ১৫-২৫ বছর। অধিক শ্রম সময় ( ১২-১৮ ঘন্টা), নামমাত্র ছুটি-ছাটা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় স্বল্প মজুরীতে শ্রমিকেরা এক দূর্বিসহ জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি কথায় কথায় চাকরী ছাঁটাই, ওভারটাইম মেরে দেয়া, দেরীতে বেতন দেবার মাধ্যমে নিয়মিতভাবে মজুরীর একটা অংশ আত্মসাৎ করা, নারী শ্রমিকদের সাথে অপমাননাকর আচরণ, মালিকদের পোষা বাহিনী কর্তৃক মারপিট-নির্যাতন কার্যত শ্রমিকদের অবস্থা ১৯ শতকের ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণীর ন্যায় মজুরী দাসেরই জীবন। শ্রমিকদের এ পুঞ্জিভূত ক্ষোভ মাঝে মাঝেই বকেয়া বেতন, ন্যায্য মজুরী ও নানা ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিষ্ফোরিত হয়ে উঠলে তার উপর নেমে আসে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্যাতন।
এমনতর নির্মম শাসন-শোষণে জর্জরিত শ্রমিকদের স্বাভাবিক মৃত্যুও আজ অনিশ্চয়তার মুখে পতিত। ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজার ধ্বংস্তুপ তার নির্মম সাক্ষী। সরকারী হিসেব মতই মৃত্যুর সংখ্যা ১১২৬ জন (যে হিসেব প্রায়ই মিথ্যা হয়)। পঙ্গুত্ববরণকারীদের সংখ্যা অসংখ্য, আর নিখোঁজদের খোঁজে এখনও শত শত মানুষ ভীড় করছে রানা প্লাজা নামক মৃত্যুকুপে। ঘটনা পরবর্তী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গাঁজাখুরী গল্প , প্রধানমন্ত্রীর মিথ্যাচার এ ট্র্যাজেডির নায়ক ভবন মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা, তার গডফাদার সংসদ সদস্য মুরাদ জং ও গার্মেন্ট মালিকদের বাঁচাতে শাসক শ্রেণী, সরকার যে কতটা মরিয়া তারই প্রমাণ বহন করে। পুর্বেও মালিকদের গাফিলতির কারণে তাজরীন, হামীম, স্পোকট্রামসহ অসংখ্য গার্মেন্টে এ ধরনের হত্যাকান্ড ঘটেছে। মুনাফাখোর মালিকদের কারখানায় অব্যবস্থাপনার বলি হতে হয়েছে হাজার হাজার শ্রমিকের। ১৯ বিলিয়ন ডলার রফতানি খাতের এ শিল্প হতে কয়েক দশকে হাজার হাজার মালিক বনে যাওয়া উদ্যোক্তাদের কাছে শ্রমিকের জীবন পুরোপুরিই মূল্যহীন। একের পর এক ঘটে যাওয়া এ ধরনের ঘটনার পরও রাষ্ট্র সরকার নির্বিকার। এযাবৎ কোন হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি। এমনকি নিহত-আহতদের উপযুক্ত তিপূরণের ব্যবস্থাও করেনি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রি সাংসদদের বিরাট অংশই গার্মেন্ট মালিক। অন্যান্য মালিকরাও শাসক শ্রেণীর কোন না কোন অংশের ছত্রছায়ায় লালিত-পালিত।
বিশ্ববাজারে পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ ২য় অবস্থানে আছে। যার সিংহভাগ ক্রেতাই পশ্চিমা বিশ্বের বিখ্যাত সব পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। গত ১ বছরে বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানীর ২৩ ভাগই গেছে আমেরিকা এবং ৬০ ভাগ ইউরোপে। জগত বিখ্যাত ওয়ালমার্ট, ডিজনী, এইচ এন্ড এমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকাকে সস্তা শ্রমের বাজার হিসেবে বেছে নেয়। সুঁই-সুতা যন্ত্রপাতি, খুচরা যন্ত্রাংশ, গার্মেন্ট এক্সেসারিজ পাশ্চাত্যে তেরি হলেও তারা টেইলারিং শপ হিসেবে এ মহাদেশগুলোকে বেছে নেয়। তদুপরি বাংলাদেশ সস্তা শ্রমের জন্য অন্যতম। মূলতঃ সস্তা শ্রমের ফলেই বহুজাতিক কোম্পানীগুলো পাকটস্থ করে শ্রমিকের উদ্বৃত্ত শ্রমের সিংহভাগ। মার্কিন মানবাধিকার সংস্থার মতে নিউইয়র্কে যে দামে বাংলাদেশের পোশাক বিক্রি হয় তার ৬০ ভাগ পায় বিদেশী বায়ার ও ব্রান্ড বিক্রেতারা। বাকী ৪০ ভাগের মধ্যে উৎপাদন ও পরিবহন খরচসহ দেশীয় মালিকদের মুনাফা অন্তর্ভুক্ত। শ্রমিকের মজুরী সেখানে শতকরা ১ ভাগ।
পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের মুনাফার যাঁতাকলে পিষ্ট আজ শ্রমিকরা, অকাল মৃত্যু অহরহ। মুনাফা, শুধুমাত্র অধিক মুনাফার লোভে লিপ্ত বিশ্বখ্যাত ব্রান্ড থেকে শুরু করে এ দেশীয় মালিকরা। অসীম মুনাফা-ক্ষুধা এদের। রানা প্লাজা-তাজরীনসহ অসংখ্য গার্মেন্টে এ সব মর্মান্তিক হত্যাকান্ড পরবর্তী বহুজাতিক ব্র্যান্ডদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার হুমকি শুধুই কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণ। এটা তারা করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রগতিশীল মহলে এমনকি বুর্জোয়া মিডিয়াতেও ব্যাপক লেখালেখি, সমালোচনার ফলে। বিজিএমইএ বা সরকারের আশ্বাস-প্রশ্বাস সবই প্রতারণা। আজও নিহত-নিখোঁজদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। আহতদের চিকিৎসা নিয়ে চলছে বিড়ম্বনা। কিছু সংখ্যক নিহতের পরিবারকে দেয়া হচ্ছে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, পরিবেশ, বকেয়া মজুরী এবং মজুরী বৃদ্ধির ন্যায্য আন্দোলনকে সরকার বরাবরের মতই রাষ্ট্রীয় বাহিনী লেলিয়ে নির্মমভাবে দমন করছে। মালিকরা শত শত শ্রমিক ছাঁটাই করছে, কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে। এই সবই চলছে সাভার হত্যাকান্ডের পরও। শ্রমিকদের শাসন-শোষণ নিপীড়ন-হত্যার সাথে অচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত মালিক-সরকার-রাষ্ট্র এবং সাম্রাজ্যবাদীরা।
আজকে সরকার বলছে শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধি করবে এর জন্য বোর্ডও গঠন করা হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ, সরকার মালিকরা মিলে কিছু মজুরী হয়ত বৃদ্ধি করবে। তাতে শ্রমিকের সমস্যার তেমন কোন সমাধান হবে না। মজুরী বৃদ্ধির সাথে সাথেই বাড়ী ভাড়া, পরিবহন ভাড়া, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাবে হু হু করে। শ্রমিক শ্রেণী যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই থেকে যাবেন। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় শ্রমিক শোষণ করে অতি মুনাফার এটাই নীতি। মালিকরা শ্রমিকদের ভয় দেখায় এই বলে যে, বিদেশীরা কারখানায় কাজ না দিলে শ্রমিকরা বেকার হয়ে না খেয়ে মরবে। অর্থাৎ আন্দোলন সংগ্রাম করো না, যা মজুরী দেয়া হয় তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাক। শিল্প-কারখানা এবং কৃষি ব্যবস্থা অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর রেখে শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণের দুর্বিসহ জীবনের অবসান কখনই হতে পারে না। সাম্রাজ্যবাদ ও দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীকে রাষ্ট্রের শাসন মতা থেকে উচ্ছেদ করে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের গণমতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদমুক্ত আত্মনির্ভরশীলতার ভিত্তিতে, কৃষিকে ভিত্তি করে, প্রথমতঃ ছোট ছোট শিল্প-কারখানা এবং পর্যায়ক্রমে ভারী শিল্প গড়তে হবে। উৎপাদন ও বন্টনের সামাজিক মালিকানার মধ্য দিয়েই শ্রমিক শ্রেণী ও শ্রমজীবী জনগণের দুর্বিসহ জীবনের অবসান হবে। এর জন্য প্রয়োজন সমাজতন্ত্রমুখী প্রকৃত গণতান্ত্রিক বিপ্লব। এই বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে হবে মার্কবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের আদর্শে সজ্জিত শ্রমিক শ্রেণীকেই। তাই, শ্রমিক শ্রেণীকে দাবী-দাওয়ার আন্দোলনে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য মুনফা ও ব্যক্তি মালিকানা ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এগিয়ে আসতে হবে। শোষণ-নিপীড়ন এবং শ্রম দাসত্ব থেকে শ্রমিকের মুক্তির এটাই পথ।

Posted in Uncategorized | Leave a comment