রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্রঃ সুন্দরবন ধ্বংস, পরিবেশ বিপর্যয় ও জমি থেকে কৃষক-উচ্ছেদের মহাপরিকল্পনা

আওয়ামী মহাজোট সরকার তার মেয়াদের শেষ লগ্নে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের নামে প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ ধংসকারী এক ঘৃণ্য চক্রান্তে মেতে উঠেছে। সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায় কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষে গত ২৯ জুন, ২০১২ ভারতীয় কোম্পানী এন.টি.পি.সি’র সাথে বাংলাদেশ সরকার এক চুক্তি স্বাক্ষর করে। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সূদূর প্রসারীভাবে পৃথিবীর অন্যতম এ ম্যানগ্রোভ ফরেষ্টের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলবে। নির্মিতব্য তাপভিত্তিক এ প্রকল্প থেকে সুন্দরবনের দুরত্ব মাত্র ১৪ কি.মি.। ইতিমধ্যেই কৃষি ও চিংড়ি চাষের আওতাভুক্ত ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ২৫ বছর আয়ুষ্কালসম্পন্ন ৬৬০ মেগাওয়াট’র দুটি পাওয়ার ইউনিট সম্বলিত এ প্রকল্পের নির্মাণ সময় প্রায় সাড়ে চার বছর। জীব-বৈচিত্র্যে ভরপুর সুন্দরবনের ক্ষয়-ক্ষতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের এ সিদ্ধান্ত ভারত-দালালীর এক নগ্ন প্রতিফলন।
সাধারণভাবেই কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে নির্মাণ পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সংরক্ষিত বনভূমি বা বসতি থেকে ১৫-২০ কি.মি.’র মধ্যে এ ধরনের প্রকল্প আন্তর্জাতিক বুর্জোয়া আইনেই অনুমোদন নেই। অথচ সরকার নিজের দায় এড়াতে নির্মিতব্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র বনের ১০ কি.মি. ক্রিটিক্যাল এরিয়া জোনের বাইরে বলে ঘোষণা দিয়ে এ প্রকল্প জায়েজ করতে চাচ্ছে। এমনকি খোদ ভারত সরকারও তাদের দেশে ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন অ্যাক্ট অনুযায়ী জীব বৈচিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, বাঘ/হাতি বা অন্য কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল সংলগ্ন ২৫ কি.মি.ব্যাসার্ধের মধ্যে এ ধরনের প্রকল্পের অনুমোদন দেয় না। দেশীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ভারতের সাথে সরকারের সম্পাদিত এ চুক্তি অতীতের ন্যায় বিদ্যুত (রেন্টাল/কুইক রেন্টাল) ন্যায় গোষ্ঠিগত হীন স্বার্থ সিদ্ধিরই পায়তারা।
সুন্দরবনের মত স্পর্শকাতর স্থানে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ সমগ্র সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্রের জন্য এক বড় ধরনের হুমকি বয়ে আনবে। নির্মাণ ও নির্মাণ পরবর্তী বিদ্যুৎ উৎপাদনকালীন সময়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ১০ কি.মি. ব্যাসার্ধের মধ্যে পরিবেশ-কৃষি-মৎস্য ও পানি সম্পদের উপর এর ক্ষতিকর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদী। প্রতিদিন প্রকল্প থেকে নির্গত হবে ১৪২ টন সালফার ডাই অক্সাইড এবং ৮৫ টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড। সুন্দরবনের মত সংরতি বনাঞ্চলের জন্য যেখানে বাতাসে এর সর্বোচ্চ মাত্রা ৩০ মাইক্রো গ্রাম, বর্তমানে যার মাত্রা ৮, সেখানে বাতাসে সালফার ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব দাড়াবে যথাক্রমে ৫৩.৪ মাইক্রোগ্রাম ও ৫১.২ মাইক্রোগ্রাম। বাতাসে বিপুল পরিমাণ এই বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে গোটা সুন্দরবন ধ্বংসের মুখে পড়বে। সরকার এখানেও শঠতার আশ্রয় নিয়েছে। সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল বা স্পর্শকাতর অঞ্চলের মানদন্ডে না দেখিয়ে বসতি অঞ্চলের মানদন্ডে বিচার করেছে। পাশাপাশি কয়লা পোড়ানোর ফলে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণও বাড়বে। এ ছাড়া চিমনী থেকে নির্গত ছাই ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে। এতে মিশে থাকা বিষাক্ত ধাতু আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ক্যাডম্মিয়াম, রেডিয়াম প্রভৃতি, যা প্রাণ-পরিবেশের জন্য এক বড় ধরনের হুমকি। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ই.আই.এ রিপোর্ট অনুসারে প্রকল্প এলাকার ৯৫ শতাংশ ও চারপাশের ১০ কি.মি. ব্যাসার্ধের মধ্যে ৭৫ শতাংশই কৃষি জমি। প্রকল্প ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ধান উৎপাদন হয় বছরে ৬৩,৬৩৮ টন এবং অন্যান্য ফসল ১,৪০,৪৬১ টন, মৎস্য উৎপাদন হয় প্রায় ৫,৭৮৮ টন। এ ছাড়া বসত বাড়ির পশু-পাখিতো আছেই। কাজ শুরু হলেই প্রকল্পাধীন অঞ্চলে ধান, অন্যান্য ফসল এবং মাছের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। জাহাজে যন্ত্রপাতি আনা-নেয়া, কয়লা পরিবহন, কয়লা নামানো-উঠানোতে পানি দূষণ ও পানির উষ্ণতা মাত্রাতিরিক্ত বাড়বে। কয়লার গুড়া, ভাঙা কয়লা ও জাহাজের বিপুল বর্জ্য ও তেল পানিতে নিঃসৃত হবে। জালের মত বিছিয়ে থাকা খাল এবং নদীগুলোর স্বাদু ও লোনা পানি, যা মাছের সমৃদ্ধ ভান্ডার বলে পরিচিত, হুমকির মুখে পড়বে। তা ছাড়া কয়লা পোড়ানো বর্জ্য, ছাই প্রকল্প এলাকায় ভরাট করা হলে বৃষ্টির পানির সাথে মিশে-চুইয়ে উক্ত এলাকার মাটি ও মাটির নীচের পানির স্তর দূষিত করবে। যা প্রকল্প এলাকায়ই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় খাদ্য ঘাটতি সৃষ্টি হবে। মাছের যোগান অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধাতব যন্ত্রপাতি ও প্রতিনিয়ত জাহাজ আসা-যাওয়ার ফলে যে উচ্চ শব্দের সৃষ্টি হবে তাতে বনের শান্ত পরিবেশ বিঘ্ন হবে। রাতে জাহাজের সার্চ লাইটের ব্যবহার প্রাণীকুলের অবাধ বিচরণকে বাধাগ্রস্থ করবে। সুন্দরবনের ইকো-সিস্টেম ভেঙে পড়বে। সার্বিকভাবে মাটি-পানি-বায়ু দূষণের ফলে অদুর ভবিষ্যতে অরণ্য অঞ্চল বলে পরিচিত সুন্দরবনের নাম-নিশানা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। পশু-পাখি হয় মারা যাবে, নতুবা অস্তিত্ব রার্থে কিছু ভারতে অবস্থিত সুন্দরবনে চলে গিয়ে আশ্রয় নিবে। ‘জলে কুমির, ডাঙ্গায় বাঘ’ বলে পরিচিত সুন্দরবন লোক কথায় পরিণত হবে। বাংলাদেশের গর্ব রয়েল বেঙ্গল টাইগারের স্থান হবে প্রাণী জাদুঘরে।
এ সব ক্ষয়-ক্ষতি জানা সত্ত্বেও হাসিনা সরকার রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বদ্ধপরিকর। জনগণের প্রতিবাদ-প্রতিরোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের “বন্ধু প্রতিম” ভারতীয়দের স্বার্থ রক্ষায় তারা মরীয়া হয়ে উঠেছে। যা থেকে গুটিকয় কমিশনভোগী মন্ত্রী, আমলা, বিশেষজ্ঞও বড় ধরনের অর্থ পাবে। প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমাণ আত্মসাৎ ছাড়াও সামনে নির্বাচনকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ ভারতের নিরঙ্কুশ সমর্থন পেতে চায়। তারই ভেট হিসেবে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে হাসিনা সরকারের এত তোড়-জোর। অপরদিকে ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে বিভোর বিএনপি’র নেতৃত্বে ১৮-দলীয় জোট নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের কট্টর বিরোধী অবস্থান নিলেও রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণসহ সকল দেশ ও গণবিরোধী কর্মসূচি প্রশ্নে নীরব। শাসক শ্রেণীর সরকারি বা বিরোধী দল নিজেদের গোষ্ঠিগত ভাগ-বাটোয়ারা বা ক্ষমতার টিকিট নিয়ে দ্বন্দ্ব করলেও উভয়ই নির্বাচনে ভারতের আশীর্বাদের প্রত্যাশী। তাই, বিরোধী দলের এই নীরবতা।
তাই সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংসের এই গণবিরোধী প্রকল্প রুখতে দেশের বিপ্লবী, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, দেশপ্রেমিক, পরিবেশবাদী সংগঠন, শক্তি ও ব্যক্তিদের ঐক্যবদ্ধভাবে কৃষক-শ্রমিক ও সাধারণ জনগণকে নেতৃত্ব দিতে হবে। জনগণের উপর চেপে বসা সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দাসানুদাসরা যত দিন রাষ্ট্রমতায় থাকবে ততদিন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ, জাতীয় সম্পদ থেকে শুরু করে জনগণের জান-মাল কোনটাই নিরাপদ নয়। এই গণবিরোধী শাসকশ্রেণী ও তাদের প্রভুদের বিতাড়িত করে গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শুধু পরিবেশ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা যেতে পারে।

[বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জন্য প্রতি ঘন্টায় পশুর নদী থেকে ৯,১৫০ ঘনমিটার পানি প্রত্যাহার করতে হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি শীতলকরণসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের পর ৫,১৫০ ঘনমিটার পানি আবার নদীতে ফেরত আনা হবে। ঘন্টায় প্রায় ৪ হাজার ঘনমিটার পানির প্রবাহ কমবে। তার মানে প্রতিদিন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যদি ২০ঘন্টা উৎপাদনে থাকে, তাহলে প্রতিদিন ৮০ হাজার ঘনমিটার পানির প্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই নস্ট হবে। এ হিসাবটাও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৯৯৫ সালে নেয়া। পশুর নদীর বর্তমান পানির প্রভাব হিসাব করলে এ হিসাবের অংকটা অনেক উচু হবে। (সৌজন্যে হাসান কামরুল/যুগান্তর)]

About andolonpotrika

আন্দোলন বুলেটিনটি হলো বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের একটি অনিয়মিত মুখপত্র
This entry was posted in আন্দোলন 15. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s