যুদ্ধাপরাধী বিচার ও শাসক শ্রেণীর বিশ্বাসঘাতকতা

শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, মহাজোট সরকার এবং “৭১-এর চেতনা”য় আপ্লুত বুর্জোয়া ও মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের বক্তব্য-বিবৃতি থেকে মনে হয় যে, বাংলাদেশে এখন একটিমাত্র সমস্যাই রয়েছে। আর তাহলো, যুদ্ধাপরাধী বিচার। এরাই দেশের সমস্ত দুর্গতি ও অনাচারের জন্য দায়ী। এদের ফাঁসি হলেই জাতি কলংক মুক্ত হবে, এমনকি দেশ শনৈ শনৈ উন্নতি করে বিশ্বে নাম করে ফেলবে। অবশ্য শেখ মুজিব হত্যার বিচারের পরও এরা প্রায় একই সুরে জাতির কলংক মুক্ত হবার ঘোষণা ও প্রচার দিয়েছিল। এ জাতির যে আর কতবার কলংক মুক্ত হতে হবে তা ভবিষ্যতই বলতে পারে!
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যে, যুদ্ধপরাধী বিচারের নামে এত যে ডংকা-নিনাদ, সেই বিচার কিন্তু আদৌ এখন হচ্ছে না। যা হচ্ছে, সেটা হলো ’৭১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার। ট্রাইব্যুনালটির নাম মোটেই “যুদ্ধাপরাধী বিচার ট্রাইব্যুনাল” নয়। এর নাম হলো “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল”। নামে আন্তর্জাতিক হলেও কার্যত এটা দেশের আইনে সম্পূর্ণ দেশীয় ব্যবস্থাপনায় একটি দেশীয় বিচার। এমনকি এতে কোন বিদেশী উকিল রাখার সুযোগও নেই। আন্তর্জাতিক মানদন্ড লংঘন হলেও তাতে কারো কিছু করার নেই। এখানে কোথাও যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি বলা হচ্ছে না। যুদ্ধে মানবাধিকার লংঘন হতে পারে, আবার যুদ্ধ ছাড়াও সেটা হতে পারে। ’৭১-সালে এদেশে একটি যুদ্ধ চলেছিল, তাতে কারো কোন দ্বিমত নেই। সেসময় মানবাধিকারও লংঘন হয়েছে বিরাটভাবে। তাতেও কোন বিতর্ক নেই। কিন্তু যুদ্ধকালীন এই মানবাধিকার লংঘনকে সরকার কেন আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করছে না? অথচ ট্রাইব্যুনালের বাইরে বেশুমার সে কথাটিই বলা হচ্ছে? যেকোন নিরপেক্ষ এবং চিন্তাশীল মানুষ এ প্রশ্নটি না করে পারবেন না। যদিও এভাবে যুক্তি উত্থাপন হতে পারে যে, যুদ্ধাপরাধী বা মানবাধিকার বিরোধী অপরাধী যাই বলিনা কেন, তাতে বড় কিছু আসে যায় না, অভিযুক্তরা ’৭১-সালে এ জাতীয় অপরাধ করেছিল কিনা সেটাই বড় বিষয়। নামে কিইবা যায় আসে?
যায় আসে বটে। অনেক বড় কিছুই যায় আসে। প্রথম যাওয়া আসার বিষয়টাই হলো এই যে, ট্রাইব্যুনালের নামটি যুদ্ধাপরাধী বিচার ট্রাইব্যুনাল না রাখার পিছনের কারণ ও উদ্দেশ্যটা তাহলে কী?
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার কিছু পর থেকেই তারা যুদ্ধাপরাধী বিচারের কার্যক্রম শুরু করে। যখন ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রশ্ন এলো, তখনও তারা এই ট্রাইব্যুনালের নাম যুদ্ধাপরাধী বিচার ট্রাইব্যুনাল বলেই প্রচার চালাচ্ছিল। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল গঠনের আগে আগে আইনমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। সেখান থেকে এসেই তিনি বলতে শুরু করেন যে, ট্রাইব্যুনালের নাম হবে যুদ্ধাপরাধ নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শাসক বুর্জোয়া শ্রেণীর আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদরা কেউ কোন প্রশ্ন পর্যন্ত উঠালো না! যে আমেরিকা ’৭১-এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধগুলোর ক্ষেত্রে পাকিস্তানী বাহিনীকে সরাসরি মদদ দিয়েছিল, তাদেরই নির্দেশে নিমিষে যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনালকে সরকার বানিয়ে ফেললো মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরাই কিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক!
কিন্তু এই নাম বদলের ড্রামার পেছনের রাজনীতিটা কী সেটাই হলো সবচেয়ে বড় বিষয়। সত্যিকারের বিষয় হলো, সরকার ও আওয়ামী লীগ বাস্তবে যুদ্ধাপরাধীর বিচার করছে না, করতে চায় না, করতে সক্ষমও নয়। ঠিক এ কারণেই আমেরিকার ‘পরামর্শ’ তারা ফেলে দিতে পারেনি। এই সত্যটি বুঝতে হলে আমাদেরকে পেছনে যেতে হবে।
’৭১-এর যুদ্ধের শেষে ভারতীয় বাহিনীর কাছে হানাদার পাক-বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র সবই ভারতীয় বাহিনীর মাধ্যমে ভারত কব্জা করে। বন্দী সৈন্য ও তাদের সমরাস্ত্র সবই কাল বিলম্ব না করে ভারত নিজ দেশে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিবকে পাকিস্তান মুক্তি দেয়। মুজিব দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হন। ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সেনা বাদেও মুক্তিযোদ্ধকে বিরোধিতার দায়ে প্রায় ৪০ হাজার এদেশী ব্যক্তিকে বন্দী করা হয়। পাকবাহিনীসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের এক প্রবল দাবী ও আবেগ ছিল মুক্তিযোদ্ধা, নিপীড়িত, শহীদ পরিবার ও সাধারণ জনগণের মধ্যে। কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে শেখ মুজিব, আওয়ামী লীগ সরকার ও ভারত। সাম্রাজ্যবাদীদের যোগসাজশে ভারতের স্বার্থে তাদের হাতে বন্দী সকল পাকিস্তানী সৈন্যকে ক্ষমা করা হয় ও পাকিস্তানকে বিনাবিচারে ফেরত দেয়া হয়। বিশেষত ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করে পাকিস্তানকে ফেরত প্রদান ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা, যা এই উঠতি বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী যুদ্ধের শুরু থেকেই করে এসেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ’৭১-এর যুদ্ধে মূল যে গণহত্যাকারী ও নিপীড়ক সেই পাকবাহিনীর মধ্য থেকে তৎকালে চিহ্নিত ১৯৫ জন নাটের গুরুকে ক্ষমা করে দেয়া কি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করা নয়? সেটা কি আওয়ামী লীগ ও তার নেতা শেখ মুজিব করেননি? তাহলে কেন তারা এখন এই ডাহা মিথ্যাটি প্রচার করে করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে যে, তারা যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করেনি, করেছে শুধু জেনারেল জিয়া?
আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা ও তাদের বর্তমান সরকার গলাবাজী করে করে এই সত্য ভুলিয়ে দিতে চায় যে, ’৭১-এ যুদ্ধাপরাধের মূল আসামী ছিল পাকবাহিনী। একে ভুলিয়ে দিয়ে তারা প্রতিষ্ঠা করতে চায় যে, বর্তমানে তাদের হাতে বন্দী গুটিকয় বিএনপি ও জামাত নেতার বিচার হলেই যেন যুদ্ধাপরাধী বিচার হয়ে যায়। কিন্তু এটা তো সহজবোধ্য যে, ’৭১-সালে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা ও বর্বর নিপীড়ন শুধু এই গুটিকয় লোক করেনি। করেছে প্রধানত পাকবাহিনীর বর্বর অফিসার ও সৈন্যরা। দ্বিতীয়ত করেছে তাদের এদেশীয় সহযোগীদের একাংশ। সেই বিচার করতে হলে প্রথমেই যা করা দরকার তাহলো দেশের ও বিদেশের সমস্ত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা করা। সেটা করার পরই মাত্র যুদ্ধাপরাধীদের সত্যিকার বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তা না করে গুটিকয় জামাত-বিএনপি নেতাকে গ্রেফতার করে বাগাড়ম্বর চালানো যে রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত সেটা বোঝা কঠিন কিছু নয়। বাস্তবে যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা করলে প্রথমেই পাক বাহিনীর চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গ আসতে বাধ্য। এবং তাদেরকে যে চরম বিশ্বাসঘাতকতার সাথে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ ক্ষমা করে দিয়েছিল সে প্রসঙ্গও উঠতে বাধ্য। এই চরম সত্যকে ধামাচাপা দেবার জন্যই যুদ্ধাপরাধী বিচার ট্রাইব্যুনালের নামটি বদলে দেয়া হয়েছে।
শেখ মুজিব ও আওয়ামী সরকার যে শুধু পাকিস্তানী বাহিনীকে ক্ষমা করে ফেরত দিয়েছিল তাই নয়, তারা যুদ্ধের পর বন্দী ৪০ হাজার অপরাধী ব্যক্তির মাঝে ৩০ হাজার জনকে ছেড়ে দেয়, এবং তাদের ভাষ্যমতে ’৭১-সালে যারা রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তানীদের পক্ষ নিয়েছিল তাদেরকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। এভাবে জামাতসহ তৎকালীন পাকিস্তানী দালাল রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গের রাজনৈতিক অপরাধ শেখ মুজিব ও আওয়ামী সরকার মাফ করে দেয়। এটা ছিল আরেকটি বিশ্বাসঘাতকতা। রাজনৈতিক অপরাধ আর মানবতাবিরোধী অপরাধ এক কাতারের নয় এটা সত্য। কিন্তু সেই ভয়ংকর সময়েও যারা পাকবাহিনীর পক্ষ নিয়েছিল তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়ার মধ্য দিয়ে ’৭১-এর সকল অপরাধীদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার ১ম কাজটি শেখ মুজিবই যে করেছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। এরই ধারাবাহিকতায় ঘটে পরবর্তীকালের আরো মাফ দেবার ঘটনাবলী।
শেখ মুজিবের পর দেশীয় গৌণ যুদ্ধাপরাধীদের মাফ করে দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার বাকী কাজটি করে জেনারেল জিয়া ও এরশাদ। এবং তার পরে করে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। এক্ষেত্রে আমরা শাসকদের ব্যক্তি নাম উল্লেখ করলেও তারা নিছক ব্যক্তি নয়; তারা হলো, ও ছিল, শাসক শ্রেণীরই বিভিন্ন সময়কার প্রতিনিধি। তাই, দেখা যাচ্ছে, ’৭১-এর পর থেকে শাসক শ্রেণীর প্রতিটি গোষ্ঠী যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়া এবং সমাজে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার অপরাধে অপরাধী। তারা কেউই এই অপরাধীদের বিচার করেনি, করতে চায়নি, কিছু নাম কা ওয়াস্তে লোক দেখানো পদক্ষেপ ছাড়া। তাদের শ্রেণীগত ঐক্যই তাদেরকে এ কাজে প্রবৃত্ত করেছে। যার সূচনা করেছিল এবং সবচেয়ে বড় ক্ষমা ঘোষণাটি করেছিল শেখ মুজিব স্বয়ং এবং প্রথম আওয়ামী সরকার।
এটা সত্য যে, ’৭১-এ যারা পাকবাহিনীর বর্বরতায় সরাসরি সহায়তা করেছিল, এবং যারা নিজেরাও অনেকে সেরকম অপরাধে যুক্ত ছিল, তাদের বিচার অবশ্যই কাম্য। কিন্তু প্রথমেই যে প্রশ্নটি উঠানো উচিত তাহলো, কেন ৪০ বছরেও এ বিচারগুলোও হলো না? সেটা কি এজন্য যে এই ৪০ বছর ধরে শুধু জিয়া বা বিএনপি তা করতে দেয়নি? নাকি সেটা এই শাসক শ্রেণীর কেউই করেনি? না আওয়ামী লীগ, না বিএনপি, না এরশাদ। জিয়া ও এরশাদের পর হাসিনা ও খালেদা (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) উভয়ে ৮০-দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই জামাতের সাথে বন্ধুত্বের বন্ধনে যুক্ত। পরে ’৯৬-সালে বিএনপি’র বিরুদ্ধে আন্দোলনে জামাত ছিল আওয়ামী লীগের প্রধান বন্ধু। যার ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে জামাত, বিশেষত গোলাম আযমের আশীর্বাদেই আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছিল। আর এত সব বছরে দেশীয় যুদ্ধাপরাধীদের মাঝে প্রায় সকলেই পুনর্বাসিত হয়েছে জামাত, জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এই সকল বুর্জোয়া পার্টির মধ্যে। শাসক বুর্জোয়া শ্রেণীর অভিন্ন স্বার্থ তাদের এই দীর্ঘ ৪০ বছরের সখ্যতার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত ও প্রমাণিত।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো, যদিইবা ধরে নেই যে, আওয়ামী সরকার এখন দেশীয় প্রায় ১০ হাজার ফৌজদারী অপরাধে অপরাধীদের বিচার করতে চায়, তাহলে প্রথম যে কাজটি তাদের করতে হতো তা হলো সেই ১০ হাজার লোকের তালিকা প্রকাশ করা। এবং তাদের মধ্যে যারা জীবিত রয়েছে তাদের নাম প্রকাশ করে প্রত্যেককে গ্রেফতার করা। তা না করে তারা কেন শুধু জামাত-বিএনপি’র গুটিকয় নেতাকে গ্রেফতার করে একটি বিচারের ভাব দেখাচ্ছে? এটা-কি যুদ্ধাপরাধী নামে এক বদ প্রহসন নয়?

* কিন্তু তাহলে প্রশ্ন হলো আজ, এখন, আওয়ামী লীগ এই সব দেশীয় গৌণ যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যকার গুটিকয় নেতার বিচারের পথে নামলো কেন? সেটা বুঝতে হলে বুঝতে হবে বর্তমানে এই শাসক শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ চরম কোন্দল ও বৈরীতাকে। এবং তাদের চরম গণবিচ্ছিন্নতা ও গণবিরোধিতাকে। তাদের প্রতারণামূলক রাজনীতিকে।
এই শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান পার্টিগুলোর কোন গণমুখী কর্মসূচিই এখন আর নেই। কিন্তু জনগণকে বিভ্রান্ত করে প্রতারণা করে তাদের ভোট আদায় করার একটি ব্যাপার রয়েছে। আর সেকাজে তাদের টার্গেট হলো নিজ শ্রেণীরই প্রতিদ্বন্দ্বী দল, বিশেষত প্রধান দলটিকে কোনঠাসা করা। বাংলাদেশের ৪০ বছরের সমস্ত ইতিহাস একথাই নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, যুদ্ধাপরাধী বিচারের এই গলাবাজী বাস্তবিক পক্ষে প্রকৃত বিচারের কোন সৎ উদ্যোগ নয়। এটা নিছক ভোটের রাজনীতি। ’৯১-এর পর ১ম বিএনপি আমলে গণআদালতের মাধ্যমে আওয়ামী সমর্থনে যুদ্ধাপরাধের প্রতীকী বিচার সত্ত্বেও ’৯৬-এর পর ক্ষমতাসীন হয়ে আওয়ামী লীগ তখন কিছুই করেনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে একই মূলা ঝুলিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে বিগত ৪ বছর তারা পার করে দিয়েছে বিচারের কানাড়া বাজিয়ে। সামনে আবার ভোট। তার আগে আগে ২/৪/১০টি রায় ঘোষণা করে, এমনকি জনমত পক্ষে নেবার জন্য ২/১টি রায় কার্যকর করে তারা পুনরায় ভোটের বৈতরণী পার হতে চায়। এক্ষেত্রে জামাত বা যুদ্ধাপরাধী তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আসল প্রতিদ্বন্দ্বী হলো বিএনপি। জামাত বর্তমানে যার প্রধান মিত্র। তাই, জামাতকে আঘাত করার মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি-কে মিত্রহীন করতে ও বেকায়দায় ফেলতে পারলে ভোটের মাঠে তারা পার পেয়ে যাবে সেটাই তাদের হিসেব। এমনকি এটাও আওয়ামী হিসেবে রয়েছে যে, যদি আগামী ভোটে বিএনপি-ই পাশ করে যায়, তাহলেও এই চালটি তাদেরকে সুবিধা দেবে। সেজন্য কয়েকটি রায় ঘোষণা করে কার্যকরের দায়িত্বটা আগামী সরকার পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখতেও তারা পারে। সেক্ষেত্রে তারা ভোটের সময় একেই কাজে লাগাবে যে, তারা পুনরায় ক্ষমতায় আসলে রায় কার্যকর হবে, বিএনপি আসলে হবে না। বাস্তবেও যদি বিএনপি সরকার গঠন করে তাহলে এমন রায় কার্যকর করা বা না করা উভয় ক্ষেত্রেই বিএনপি বেকায়দায় পড়বে। আর সেটাই হবে আওয়ামী লীগের মূল ভোট-রাজনীতি।
তবে এই ভোটের রাজনীতির খেলায় যুদ্ধাপরাধী বিচার প্রসঙ্গ এনে আওয়ামী লীগ এমন জায়গায় হাত দিয়েছে যা তাদের শ্রেণীগত বৃহত্তর স্বার্থে গুরুতর সংকট ডেকে আনতেও বাধ্য। প্রথমত এটা শাসক শ্রেণীর মাঝে এক বৈরী মারামারি চাগিয়ে দেবে এবং ইতিমধ্যেই দিচ্ছে, যার আলামত রাস্তাঘাটেই দেখা যাচ্ছে। যার দেশী ও বিদেশী প্রতিক্রিয়া আওয়ামী লীগকে ভোগ করতেই হবে। দ্বিতীয়ত কিছু যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি যদি আওয়ামী লীগই কার্যকর করে তবে সবচেয়ে বেশী লাভ হবে জামাতের, এবং আংশিকভাবে বিএনপি’র। কারণ, জামাত এখন, দীর্ঘ ৪০ বছর পরে আর পুরনো নেতা নির্ভর কোন পার্টি নয়। এমন কিছু নেতার বিচার তাদেরকে মোটেই দুর্বল করবে না। বরং, তারা একদিকে তাদের ‘শহীদ’ নেতাদের পতাকা তুলে ধরতে পারবে। অন্যদিকে এইসব যুদ্ধাপরাধী নেতাদের থেকে মুক্ত হলে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় রাজনীতি পরিচালনা অনেক সহজ হয়েও আসবে। এর অর্থ হলো, আওয়ামী লীগের “’৭১-এর চেতনা” বিক্রির রাজনীতির বড় অবসান ঘটবে। তৃতীয়ত আওয়ামী লীগ যখন কয়েকটি বিচার করবে, তখন আরো কয়েক হাজার বিচারের প্রশ্ন উঠবেই, যা আওয়ামী বা শাসক শ্রেণীর কেউই করতে সক্ষম নয়। এটা একদিকে তাদের বিশ্বাসঘাতক চরিত্রকে উন্মোচন করবে, অন্যদিকে তাদের ব্যবস্থার বিশৃংখলা ও বৈরীতায় তা বর্ধিত মদদ রাখবে। এসবই বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর সংকটকে বাড়িয়ে ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ভঙ্গুরতাকে বৃদ্ধি করবে, যা শেষ পর্যন্ত বিপ্লবী রাজনীতির জন্য সহায়ক হবে, যদি বিপ্লবী রাজনীতি সঠিক পথে চলে।
* যারা প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে চান, যারা একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রকৃতই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও রাজনীতি চান, যারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও প্রকৃতই একটি দেশপ্রেমিক রাজনীতি চান, তাদেরকে যুদ্ধাপরাধী বিচারের এই আওয়ামী প্রহসন ও প্রতারণা থেকে নিজেদের মুক্ত করতেই হবে। বিশেষত যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে আওয়ামী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির খপ্পর থেকে তাদের মুক্ত হতে হবে। নতুবা ’৭১-এ যেমনি তারা আওয়ামী জাতীয় বেইমানদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন, যেমনি তারা ’৭৪-এ আওয়ামী দেশদ্রোহীদের দ্বারা যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করার বিশ্বাসঘাতকতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন, তেমনিভাবে প্রতারিত হতেই থাকবেন।
রাজাকার ও ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীরা ’৭১-এ পরাজিত হয়েছে। তারপর থেকে তারা আর কখনো এদেশের জনগণের প্রধান শত্র“র স্থানে যেতে পারেনি। সেটা সম্ভবও নয়। কারণ, এখন আর সম্ভব নয় পাকিস্তানে ফেরত যাওয়া। সম্ভব নয় পাক বাহিনীকে ফিরিয়ে আনা। বরং সেই সব দেশীয় অপরাধীরা বিগত ৪০ বছর ধরে এদেশের বাঙালী শাসক বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যেই অঙ্গিভূত হয়ে গেছে। যার প্রধানতম প্রতিনিধি এখন আওয়ামী লীগ আর বিএনপি। যাদের পেছনে রয়েছে সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্র। বিদেশে রয়েছে ভারত, আমেরিকাসহ দেশ, জাতি ও জনগণের শত্র“রা। এরাই এখন জনগণের আসল শত্র“। আসল শত্র“কে বন্ধু ভাবা, আর তাদের সাথে মিলে গৌণ শত্র“দের বিরুদ্ধে লাফালাফিতে জনগণের কোনই মঙ্গল নেই। যা কিনা তথাকথিত বাম সিপিবি, বাসদ ও বামমোর্চারা করছে। এমনকি একটি সরকারী হরতালও তারা করে ফেলেছে। সরকার বা শাসক শ্রেণীর বি-টিম হবার পুরনো খেলায় সিপিবি নিজে-তো নেমেছেই, অন্য কিছু গর্দভকেও নামিয়েছে। জনগণের প্রয়োজন হলো এই প্রতারণার ফাঁদ ভেঙ্গে ফেলা এবং শাসক বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে বর্শা তাক করে নিজেদের বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের সংগ্রামকে জোরদার করা।

About andolonpotrika

আন্দোলন বুলেটিনটি হলো বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের একটি অনিয়মিত মুখপত্র
This entry was posted in আন্দোলন ১৩. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s